প্রসঙ্গ : নোট ব্যান (১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬)

ঋণস্বীকার : একমেবাদ্বিতীয়ম সুকুমার রায়। বানানে যতটা সম্ভব ওঁকেই কপি করার চেষ্টা করেছি। বাকিটা full-কপি আর বাঁধাকপি।
hijbijbij_transp
আমি ভাবছি এইবেলা পথ খুঁজে বাড়ি ফেরা যাক, এমন সময় শুনি পাশেই একটা ঝোপের মধ্যে কিরকম শব্দ হচ্ছে, যেন কেউ হাসতে হাসতে আর কিছুতেই সামলাতে পারছে না। উঁকি মেরে দেখি, একটা জন্তু– মানুষ না বাঁদর, প্যাঁচা না ভূত, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না– খালি হাত-পা ছুঁড়ে হাসছে, আর বলছে, “এই গেল গেল– নাড়ি-ভুঁড়ি সব ফেটে গেল।”
হঠাৎ আমায় দেখে সে একটু দম পেয়ে উঠে বলল, “ভাগ্যিস তুমি এসে পড়লে, তা না হলে আর একটু হলেই হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছিল।”
আমি বললাম, “তুমি এমন সাংঘাতিক রকম হাসছ কেন?”
জন্তুটা বলল, “কেন হাসছি শুনবে? মনে কর, ভারতটা যদি গেরুয়া রংয়ের হত, আর সব সুপারস্টাররা তাদের সিনেমার গানে গেরুয়া শব্দটা রাখত, আর সেই সিনেমাগুলো ঘুলিয়ে প্যাচপ্যাচে কাদা হয়ে যেত, আর লোকগুলো সব পেটিএম-এ সেই সিনেমার টিকিটে ডিসকাউন্ট পেয়ে ধপাধপ আইনক্সে আছাড় খেয়ে পড়ত, তা হলে– হোঃ হোঃ হোঃ–” এই বলে সে আবার হাসতে-হাসতে লুটিয়ে পড়ল।
আমি বললাম, “কী আশ্চর্য! এর জন্য তুমি এত ভয়ানক করে হাসছ?”
সে আবার হাসি থামিয়ে বলল, “না, না, শুধু এর জন্য নয়। মনে কর, একজন লোক আসছে, তার এক হাতে ডেবিট কার্ড আর-এক হাতে একটা দু’হাজারের নোট, আর লোকটা মুদির দোকানে নোটটা দিতে গিয়ে ভুলে কার্ডটা বাড়িয়ে ফেলেছে– হোঃ হোঃ, হোঃ হোঃ, হোঃ হোঃ হোঃ হা–” আবার হাসির পালা।
আমি বললাম, “কেন তুমি এইসব অসম্ভব কথা ভেবে খামকা হেসে-হেসে কষ্ট পাচ্ছ?”
সে বলল, “না, না সব কি আর অসম্ভব? মনে কর, একজন লোক এগারো লাখি সুট পরে, রোজ সেই সুট পরে আম্রিকা-রাশিয়া যায়, একদিন একটা উর্জিত পটেল এসে সেই সুট খেয়ে ফেলেছে– হোঃ হোঃ হোঃ হো–”
জন্তুটার রকমসকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কে? তোমার নাম কি?”
সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “আমার নাম ডিমনিটাইজেশন, আমার ভায়ের নাম নোটের চোট, আমার বাবার নাম যা-খুশি-একটা-করলেই-হল, আমার পিসের নাম ডিমনিটাইজেশন–“
আমি বললাম, “তার চেয়ে সিধে বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ নরেন্দ্র moody।”
সে আবার খানিক ভেবে বলল, “তা তো নয়, আমার নাম ভক্ত্, আমার মামার নাম ভক্ত্, আমার খুড়োর নাম ভক্ত্, আমার মেসোর নাম ভক্ত্, আমার শ্বশুরের নাম ভক্ত্–”
আমি ধমক দিয়ে বললাম, “সত্যি বলছ? না বানিয়ে?”
জন্তুটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, “না, না, আমার শ্বশুরের নাম গোলাপি নোট।”
আমার ভয়ানক রাগ হল, তেড়ে বললাম, “একটা নোটও বিশ্বাস করি না।”
অমনি কথা নেই বার্তা নেই, ঝোপের আড়াল থেকে একটা মস্ত দাড়িওয়ালা ছাগল হঠাৎ উঁকি মেরে জিজ্ঞাসা করল, “আমার কথা হচ্ছে বুঝি?”
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, “না”, কিন্তু কিছু না বলতেই তড়তড় করে সে বলে যেতে লাগল, “তা তোমরা যতই তর্ক কর, এমন অনেক নোট আছে যা ছাগলে ব্যান করে না। তাই আমি একটা বক্তৃতা দিতে চাই, তার বিষয় হচ্ছে– ছাগলে কি না ফাটকা খ্যালে।” এই বলে সে হঠাৎ এগিয়ে এসে বক্তৃতা শুরু করল–
“হে মমতা, কেজরীওয়াল এবং পোগোল গাঁধী এবং স্নেহের ভক্তবৃন্দ, আমার গলায় ঝোলানো সার্টিফিকেট দেখেই তোমরা বুঝতে পারছ যে আমার নাম শ্রী মিত্রোঁ সিং নোটে চোটবিশারদ। আমি খুব চমৎকার মিত্রোঁ হাঁকতে পারি তাই আমার নাম মিত্রোঁ আর হাঁকডাক তো শুনতেই পাচ্ছ। ইংরেজিতে লিখবার সময় লিখি N. M. অর্থাৎ চাওয়ালা। কোন-কোন জিনিস চেপে স্পেসে যাওয়া যায় আর কোন-কোনটায় যাওয়া যায় না, তা আমি সব পরীক্ষা করে দেখেছি, তাই আমার উপাধি হচ্ছে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি। তোমরা যে বল– মোদীতে কি না ব্যান করে, বিজেপি কি না হিন্দুত্ব দাগায়,– এটা অন্যায়। এই তো একটু আগে ঐ হতভাগা বলছিল যে মোদীতে নোট ব্যান করে। এটা একেবারে সম্পূর্ণ মিথ্যাকথা। আমি অনেকরকম অম্বানি ললিত নেড়ে দেখেছি, ওতে দাবড়ানোর মতো কিচ্ছু নেই। অবিশ্যি আমরা মাঝে-মাঝে এমন অনেক জিনিস খাই, যা তোমরা খাও না, যেমন– ফাওয়াদ খান, কিম্বা পর্ন, কিম্বা জাতীয় সঙ্গীতে উঠে দাঁড়ানো কিম্বা এনডিটিভি-র মতো ভালো ভালো জাতীয় নিউজ চ্যানেল। কিন্তু তা বলে মজবুত কোনও অর্থনীতি আমরা কক্ষনো খাই না। আমরা ক্কচিৎ কদাচিৎ কখনও করন জোহর কিংবা ম্যাগি নুডলস এ-সব একটু আধটু খাই বটে, কিন্তু যারা বলে আমরা চাষা-ভুষো কিম্বা খেটে খাওয়া মানুষের মেয়ের বিয়ে খাই, তারা ভয়ানক মিথ্যেমিত্রোঁ। যখন আমাদের মনে খুব তেজ আসে, তখন শখ করে অনেকরকম রঘুরাম আমরা চিবিয়ে কিম্বা সরিয়ে দেখি, যেমন, বলিউড সিনেমায় পাকিস্তান, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের দাবি কিম্বা মহারাষ্ট্রে বিফ কিম্বা বলিউডে খিস্তি কিম্বা ইন্ডিয়াস ডটার। শুনেছি আমার ঠাকুরমা একবার ফুর্তির চোটে ১৯৭৫-৭৭ ইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ার করেছিলেন। কিন্তু তা বলে পশ্চিমবঙ্গে সারদার তদন্ত, কিম্বা স্পেকটারে বন্ডের চুমু, এসব আমরা কোনওদিন খাই না। কেউ-কেউ প্রাইমারিতে ইংরেজি খেতে ভালবাসে, কিন্তু সেসব নেহাত ছোটখাটো বাজে সিপিএম। আমার ছোট বোন একবার একটা আস্ত হিন্দির ডিকশনারি খেয়ে ফেলেছিল–” বলেই মিত্রোঁ সিং সেহওয়াগের দিকে মুখ তুলে ভাইয়োঁ অওর বেহনো বলে ভয়ানক কাঁদতে লাগল। তাতে বুঝলাম যে দেশভক্তি খেয়ে রবীন্দ্র জাদেজার শুভবুদ্ধির অকালমৃত্যু হয়েছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s