শেষ মানেই নতুন শুরু (২ ডিসেম্বর, ২০১৬)

একটা বাড়ি তৈরির সময় কখনও তাকে খেয়াল করেছ ঋতু? কীভাবে তার সদ্য তৈরি ছাদের ঠিক তলায় কাঠ আর বাঁশ দিয়ে সেই ছাদকে পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের সঙ্গে লড়াই করতে শেখানো হয়? কিংবা ধরো, যে বাড়িগুলো অনেক-অনেক উঁচু, সতেরো… কিংবা ধরো, সাঁইত্রিশতলা, কীভাবে তাদের সারা দেহের চারপাশে লোহার একটা মশারি-মতো আবরণ পরিয়ে রাখা হয় অনেকদিন, দেখেছ? লোহার সেই আবরণ বেয়ে মিস্ত্রিরা অবলীলায় কেমন উঠে পড়ে বাড়ির দেওয়ালের গায়ে! আদর-যত্নে, পরম মমতায় সেই মিস্ত্রিরা তাদের শিল্পী-হাত বুলিয়ে দেয় সারা বাড়ির গায়ে, ঋতু, তুমি খেয়াল করেছ কখনও? তাদের সেই আদর-যত্নের নিশ্চিন্তি প্রশ্রয়েই দেখতে-দেখতে খিলখিলিয়ে কেমন ভাবে সেজে ওঠে শহরের যত বাড়িগুলো? তখন আর তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই, কীভাবে, কত জোড়াতালি এক হয়ে তবে মাথা তুলতে পেরেছিল ওরা…
love-breakup-sad
ঋতু তুমি কখনও দ্যাখোনি, ছোটবেলায় অনেকের ছোট্ট সাইকেলের পিছনের চাকার দু’পাশে লাগানো থাকে আরও দুটো ছোট্ট-ছোট্ট চাকা? যারা নিজেরাও বিলক্ষণ জানে, কিংবা হয়তো জানেই না, আর ক’দিন পর খুদে সাইকেলের খুদে মালিক যখন নিজে-নিজেই শিখে নেবে ভারসাম্যের সহজ অঙ্ক, তারপর আর কোনওদিনও ডাক পড়বে না ওই দুই ছোট্ট চাকার। ছোট্ট চাকারা সে কথা যদি বা জেনেও থাকে, তাতে তাদের বিশেষ কিছু যায় আসে না কিন্তু। তা বলে কি তারা গোঁসা করে খিল দেয় ঘরে? ফেলে ছড়িয়ে আছড়ে মারে ভাতের থালা? ছিঁড়ে কুটিকুটি করে কি পুজোর মালা? করে, ঋতু?

ঘুড়ি জানে, সুতো কাটা পড়লেই তারও জারিজুরি শেষ। শেষ সুতোর সঙ্গে তার আজন্ম বন্ধুত্বও। মোড়ক জানে উপহারের সঙ্গে তার প্রেম টেকার নয়। হাসি বিলক্ষণ জানে তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে উলটোদিকের লোকটার ব্যবহারের উপর। ব্যাভার খারাপ, মানে হাসিরও মন খারাপ। ফাঁসির দড়ি যত ভালবেসে জড়িয়ে ধরবে আসামীর গলা, ততই সে হতভাগ্য ছেড়ে যাবে তাকে। দশমী জানে সে এলেই পুজোর আনন্দ শেষ, অথচ না এসে তার উপায় কী? সে এলে ঋতু, তবে না পরের পুজোর জন্য মধুর অপেক্ষার শুরু!

আমাদের সব সম্পর্কগুলোও তেমনই সবসময় চিরন্তন হয় না ঋতু। আর যখন হয় না, তখনই সার্থক হয় না কি? ঠিক ওই কাঠ আর বাঁশগুলোর মতো, যারা বাড়ির ওই ছাদকে সাহস জুগিয়েছিল, মাধ্যাকর্ষণ ভুলতে। ঠিক ওই চাকা দুটোর মতো, যারা ছোট বাচ্চাকে ভরসা দিয়েছিল, ভয় না-পেয়ে এগিয়ে যাওয়ার। ভেঙে যাওয়া, ছেড়ে যাওয়া সেই সম্পর্কগুলো আমাদের শুধু চোখ ভরা কান্না আর বুক ভরা মোচড় দিয়ে যায়নি ঋতু। তারা যেতে-যেতে শিখিয়ে গিয়েছে আমাদের।

শিখিয়েছে, পৃথিবীর যেখানেই কখনও মন ভেঙে বেরিয়ে আসে চোখের এক-এক ফোঁটা জল, সমুদ্রের অনেক তলায় ঠিক তখন-তখন তৈরি হয় একটা করে মুক্তো। নিষ্কলুষ, নিষ্পাপ…

আমরা দু’জন একসঙ্গে থেকে এবং না-থেকে আর কিছু পেরেছি কিনা জানা নেই ঋতু… তবে একখান অমন মুক্তো সাগরের তলায় আমাদের নামেও লেখা হয়েছে, জানো তো? হয়েছেই হয়েছে…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s