এক পাটি জুতো (২০ অক্টোবর, ২০১৬)

sunset_2007-1

এক পাটি জুতো। একটু বড় মাপেরই। পথচলতি মানুষজনের যে কারও পায়ে যেন সে ফিট করে যেতে পারে, সে কারণেই অমন গড়ন তার। কিন্তু সবার পায়ে ফিট করার তার এই তাগিদ কীসের? কারণটা তার মালিক।

মালিক তার মস্ত শহরের ব্যস্ত ফুটপাথের একপাশে একচিলতে জায়গায় চটি-জুতো সেলাই করে। মালিক তার সকাল আটটায় শহরের অন্যপ্রান্তে সস্তার বস্তির একফালি ঘর থেকে বেরিয়ে টুকটুক করে হেঁটে এসে পৌঁছয়। পৌঁছয় মস্ত শহরের ব্যস্ত ফুটপাথের একপাশে মালিকের নিজস্ব একচিলতে জায়গাটুকুতে।

মালিকের বড় আদরের এই একপাটি জুতোর জীবনে সেরকম কোনও দুঃখ নেই। ন’মাসে-ছ’মাসে কখনও তার গায়ে সামান্য আঁচড়টুকুও লাগলে মালিক সব কাজ ফেলে আগে লেগে পড়ে তারই সেবা-শুশ্রূষায়। হবে না-ই বা কেন? মালিকের একফালি একচিলতে নিজস্ব কাজের জায়গাটুকুতে যে-পথিকই এসে দাঁড়ায় নিজের-নিজের চটি-জুতোর সেবা-যত্নের আশায়, মালিক গোড়াতেই ডেকে পাঠান তার বড় আদরের এই বড় জুতোর পাটিকেই।

যাদবপুরের সুকল্যাণবাবুর নতুন কেনা কিটোটার একটা স্ট্র‍্যাপ মেট্রো থেকে নামার মুখে পট করে ছিড়ে মুখ পুড়িয়েছে। মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে অগত্যা সুকল্যাণবাবু এসে দাঁড়িয়েছেন বড় জুতোর পাটির মালিকের দোকানেই। শ্যামবাজারের সুবর্ণ বসুর সদ্য ছ’মাস আগে কেনা চামড়ার চটিটা তাদের বাড়ির পোষা কুকুর গতকাল সারারাত প্রাণভরে চিবিয়ে ছাতু করেছে। ছিন্নভিন্ন সেই চটির মৃতদেহ কোনওরকমে পায়ে গলিয়ে মৃতকে পুনর্জীবন দেওয়ার আশা বুকে নিয়ে সুবর্ণবাবুও এসে দাঁড়াবেন এই দোকানেই। আর যে সময়ে সুকল্যাণবাবু বা সুবর্ণবাবুর ছেড়া-খোড়া জুতোর পরিচর্যা করবে মালিক মুচি; বড় পাটির আমাদের জুতোই আগলে রাখবে ভদ্রলোকদের পায়ের পাতা।

বড় পাটির জুতোকে পথচলতি তার জাতভাইদের অনেকেই ‘বারোয়ারি’ বলে উপহাস করে। কেউ কেউ তাকে দেখে মুচকি হাসেও, লক্ষ করেছে সে। হাসুক। উপহাসুক। গায়ে মাখে না বড় পাটির জুতো। সে জানে একলা মানুষের চটি-জুতোরাও তাদের মালিকের মতোই ভীষণ একলা। ভীষণ… ভীষণ স্বার্থপর। ঠিক মানুষের মতোই।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। বেলা বাড়ে। একসময় মস্ত ব্যস্ত শহরের পশ্চিমের আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর পিছনে ক্লান্ত দেহে মুখ লুকোন সুয্যিঠাকুর। বড় পাটির জুতো দ্যাখে সবটাই। পৃথিবী-মায়ের মতোই অসীম ভালবাসা বুকে নিয়ে স্মিত হাসি মুখে মেখে মালিকের একপাশে চুপটি করে শান্ত হয়ে দিনভর বসে থাকে সে।

কেউ জানে না। কিন্তু অহোরাত্র নানা বয়সের, নানা রংয়ের, নানা ধর্মের মানুষের পায়ের পাতার সঙ্গে চুপিচুপি গল্প চলে বড় পাটির জুতোর। গল্পে-গল্পেই সে দেখতে পায় আশপাশের সৃষ্টিছাড়া উপহাসের উৎসকে। বুঝতে পারে, মানুষ যবে ধুলো ঘাঁটতে ভুলে গিয়ে নিজেকে ঢেকে নিল চটি-জুতোর আড়ালে, যবে দেওয়াল তুলে, মেঝে গেঁথে মেরে ফেলল মাটির গন্ধকে, যবে উড়তে শিখে ভুলেই গেল পায়ে হাঁটার আনন্দ, সেদিন থেকেই আর মানুষ নেই সে।

ওই ঢাকতে গিয়ে, মারতে নেমে, ভুলতে বসে কখন যেন নিজেও পালটে গেছে ওরা। নিজের অজান্তেই পালটে গেছে। বড্ড পালটে গেছে…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s