মায়ের জন্য (২ অক্টোবর, ২০১৬)

Power of Wordsআজ গাঁধীজির জন্মদিন। জন্মদিন আর-একজনেরও।

আমার এযাবৎ জীবনের সবচেয়ে বেশি গর্ব করার মতো যে অংশটা, সেটা আমার স্কুলজীবনের বছরগুলো। আরও স্পেসিফিক্যালি বলতে হলে, ক্লাস ফাইভ থেকে টুয়েলভ-এর সময়টা। আমার ছোটবেলায় মালদহ রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ বিদ্যামন্দিরে ক্লাস ফাইভে ভর্তির জন্য অ্যাডমিশন টেস্ট নেওয়া হত। হয়তো এখনও সেটা হয়, তবে আমার সময়ে সেই অ্যাডমিশন টেস্ট একটা ছোটখাটো আইআইটি এনট্রান্স টেস্টের মতোই মারাত্মক কঠিন হত। সেই পরীক্ষার জন্য আমাকে গড়েপিটে তৈরি করেছিলেন দু’জন মানুষ। দেবাশিস স্যার নামে আমার এক শিক্ষকমশাই। আর অন্যজন আমার ঘরের লোক। আমার বাবা। তারপরেও বাকি সারাটা জীবন বাবা আমাকে পড়িয়েছে ঠিকই। কিন্তু আসল যে লোকটা বস্তুতই গাধা পিটিয়ে ঘোড়া তৈরি করেছিল পরের আটটা বছর, আজ তাঁর জন্মদিন।

আমি ছোটবেলায় খুব পেটুক ছিলাম। বিস্কুটকে ‘বিকু’ বলতাম। সারাদিন বাড়িময় ‘বিকু খাব, বিকু খাব’ বলে ঘুরে বেড়াতাম। বাড়িতে কখনও কেউ কিছু খেলেই ব্যস! আমারও তাতে ভাগ বসানো চাই। খুদে রাক্ষসের ভয়ে বাবা-মা কখনও টুকটাক কিছু খেলেও রীতিমতো লুকিয়ে-লুকিয়ে খেত। ছোট্ট পেটের হজমশক্তিও ন্যানো লেভেলের। ফলত, শুনলে অবাক লাগে না যে এক দুপুরে নাকি পেটখারাপের চোটে এক-এক করে ৩৮ খানা প্যান্ট নষ্ট করে ফেলেছিলাম আমি। (এইখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বাচ্চা ছেলের অতগুলো প্যান্ট যাদের বাড়িতে, তারা কি তবে হেবি বড়লোক? ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। দুই ভাইয়ের মধ্যে যারা ছোট হয়, নিজের জামাকাপড়ের পাশাপাশি তাদের কপালে বাই ডিফল্ট জুটে যায় বড়জনের ছোট হয়ে যাওয়া বাতিল জামা-প্যান্টগুলোও। সেই দুঃখের গপ্পো পরে কোনওদিন হবে না হয়।  সে যাহোক, কথা হচ্ছিল যে লোকটাকে নিয়ে, সে ওই এক দুপুরে নিরলস কেচে ফেলেছিল এক-এক করে ৩৮ খানা প্যান্ট-ই। একসঙ্গে নয় কিন্তু। এক-এক করে। ৩৮ খানা।

সেই লোকটা চাকরিবাকরি করত না। আর-একটু বড় হওয়ার পর সারাক্ষণ ছিনে জোঁকের মতো লেগে থাকত আমার পেছনে। বাড়ি বসে যে একটা-দুটো নেশা মানুষ করতে পারে, সেরকম একটাই নেশা ছিল লোকটার। টিভি দেখার। এমনও হয়েছে যে আমি এক ঘরে বসে পড়াশোনা করছি। আর সে হয়তো উলটোদিকের ঘরে বসে খুব লো ভলিউমে সিরিয়াল দেখছে। মুখোমুখি দুই ঘরের দরজাই ভেজানো, টিভির শব্দে যাতে আমার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত না ঘটে, সেইজন্য। তার মধ্যেও দেখেছি, ওই লোকটা ঠিক একটু পর-পর উঠে এসে দেখে যাচ্ছে, আমি সত্যিই মন দিয়ে পড়ছি তো? এইরকম সময়গুলোয় হেবি রাগ হত। গরমের ছুটি, পুজোর ছুটির সারা দুপুরগুলো লোকটার নজরদারিতে থাকতে-থাকতে অনেকবার মনে হত, আরও অনেকের বাড়ির মতো আমার বাড়ির এই একটা লোকও দিব্যি চাকরি-বাকরি করতে পারত তো একটা!

সাত-আটবছরের ব্যবধানে আজ সেখানে প্রতিদিন, উঠতে-বসতে ভগবানকে ধন্যবাদ দিই, ওই লোকটাকে সরকারি/বেসরকারি চাকুরে না করে আমার জীবনে পাঠানোর জন্য। আজ সেই লোকটারই জন্মদিন।

প্রেমে পড়লে লোকে নিজের পার্টনারকে প্রায়ই বলে ফ্যালে, ‘আমি তোমার জন্য নিজের জীবনও দিয়ে দিতে পারি।’ বাক্যটার গুরুত্ব ভাল করে না বুঝেই বলে ফ্যালে টপাটপ। আমার জীবনে কিন্তু ওই একজন সত্যিই নিজের জীবনের সর্বস্ব দিয়ে আমার জীবনটা তৈরি করে দিয়েছে। মাধ্যমিক আর এইচএস-এ মোটের উপর নজরকাড়া রেজাল্টই হয়েছিল আমার। সেই খবর বেশ কিছু পেপার-টেপারেও বেরিয়েছিল ছোট-বড় করে। সাতবছর হতে চলল, সেই লোকটা আজও ওই খবরের কাগজগুলো যত্ন করে সরিয়ে রেখে দিয়েছে। চাকরিসূত্রে আমি এখন আর মালদার ওই বাড়িটায় থাকি না। কিন্তু ওই কাগজগুলো থাকে। যেগুলো এখনও নাকি মাঝে-মাঝেই খুলে-খুলে দ্যাখে, আর কখনও হাসে, কখনও আনন্দে কাঁদে ওই লোকটা। আজ যাঁর জন্মদিন।

মাসতিনেক আগে আমার বাবাকে নিয়ে কিছু লিখে আমি ফেসবুকে দিয়েছিলাম। বাবা শক্ত মানুষ। লেখাটা পড়ে না কাঁদলেও ওই লোকটা কিন্তু খুব একচোট কান্নাকাটি করেছিল। আর তার পরদিন হাসিমুখে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমায় নিয়ে কবে লিখবি এরকম কিছু?” আমি “হ্যাঁ, হ্যাঁ, হবে, হবে,” করে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, ‘এড়িয়ে গিয়েছিলাম’। কারণ সত্যিই এই লোকটাকে নিয়ে বলতে বা লিখতে বসলে খেই হারিয়ে যায় আমার। এখনও আমাদের ঝগড়া হয়, খুব রাগ হয় এখনও লোকটা আমায় বকাবকি করলে। দুম করে বলে ফেলি, “আরে, আমি কি এখনও বাচ্চা নাকি?”

কিন্তু ওই লোকটার কাছে তো আমি বাচ্চাই। কালকে ছিলাম, আজ আছি, আগামীকালও বাচ্চাই থাকব। মাথা কুটে মরে গেলেও অমন ভাবে নিজের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে অন্য কারও জীবন গড়ে দিতে পারব কি? উঁহু। কথায় বলে, নিজ ভাগ্য মানুষ নিজে গড়ে। আজ লোকটার জন্মদিন বলেই বলছি না, বছরের যে কোনওদিন, আমার জীবনের রাস্তার যে কোনও মোড়ে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় আমি গলা ফাটিয়ে বলতে পারি, আমার এযাবৎ জীবনটা, সেটা ছোট-বড় যেমনই হোক, যেটুকুই হোক, ওই লোকটার তৈরি করে দেওয়া। ওই লোকটা, যে আমার মতো ডাহা ফাঁকিবাজকে পড়াতে-পড়াতে এক দুপুরে স্নানই করেনি! লোকটা স্নানে গেলে ওই দশ-পনেরো মিনিটও যদি আমি পড়ায় ফাঁকি দিই! যে লোকটা আজও আমাকে নিয়ে চিন্তা করে দিন-রাত। যে লোকটা আজও অহরহ বলে, “কবে যে মানুষ হবি তুই!” যে লোকটা আজও আমি প্রেমে পড়লে/না-পড়লে সেই নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাঁটা হয়ে থাকে। বাবাকে সব কথা খুলে বলার সাহস না পেলেও আমার জীবনের প্রথম যে বন্ধুর সঙ্গে আজও আমি প্রাণ খুলে শেয়ার করতে পারি যা-ইচ্ছে-তাই… আজ সেই লোকটার জন্মদিন।

যে লোকটাকে আজ থেকে পঁচিশবছর আগে আমি পেয়েছিলাম আমার মা হিসেবে। আজ তাঁর জন্মদিন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s