ডাইমেনশন (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)

সরস্বতী দেবীর বাড়ি ঢুকে ধপ করে ডাইনিংয়ের পদ্মছাপ সোফাটা দখল করে গা ছেড়ে দিলেন দেবর্ষি নারদ। খোলা আকাশে রোদের তাপ সয়ে-সয়ে কাঁহাতক আর ঘুরে মরা যায় এই বয়সে! তার উপর এই এক বিচ্ছিরি নিয়ম, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, আদুল গা-ই ভরসা! রোদে পুড়ে-পুড়ে অতএব কবেই সোনার অঙ্গ ছাই হয়েছে দেবর্ষির। সময় থাকতে সূয্যিদেবের সঙ্গে রাপচিক একখান র‍্যাপো করে রাখতে না পারলে যা হয় আর কী!

উপরন্তু এই তল্লাটের একমাত্র জেন্টস পার্লারে গিয়ে নিজেকে যে একটু ঘষে-মেজে নেবেন, তারও উপায় নেই। সেই পার্লারের স্বৈরাচারী মালিক হয়ে বসেছে শিবঠাকুরের বড় ছেলে কাত্তিক। তার রূপের দাপটে… মানে, ইয়ে… সত্যি বলতে কী… সেই জেন্টস পার্লারে লালনদের পরিবর্তে ললনাদের ভিড়ই দেখা যায় বেশি। এবং… বলাই বাহুল্য, ইয়ে, মানে, সেই মেয়েরা কেউই রূপ চর্চার হেতু সেই পার্লারে পা রাখেন না। বরং সুপুরুষ কাত্তিকঠাকুরের সঙ্গে একটিবার… ahem!

সে যাইহোক,দেবর্ষির আগমনের খবর শুনে ততক্ষণে অন্দরমহল থেকে দেবী সরস্বতী বাইরের ঘরে বেরিয়ে এসেছেন। পরিচারিকারা ইতিমধ্যেই দেবর্ষির জন্য সাজিয়ে রেখে গিয়েছে মসালা কোল্ড ড্রিঙ্কের কলস। নারদ তাতেই চুকুস চুকুস চুমুক দিচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ ঘর আলো করে দেবীর প্রবেশ। দেবর্ষি নারদ সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়ে দেবীকে যথোচিত সম্ভাষণ করে অভ্যর্থনা জানালেন। দেবীও প্রত্যুত্তরে উলটোদিকের পদ্ম ব্র্যান্ডের সুবিশাল সোফায় ডুবে গিয়ে দেবর্ষির কুশল সংবাদ জানতে চাইলেন।

saraswati-imageপ্রশ্নটুকুরই অপেক্ষা ছিল। দেবর্ষি উত্তেজিত ভাবে বলতে শুরু করলেন, “কী আশ্চয্যি ঘটনা এইমাত্তর দেখে আসছি দেবী! বললে পেত্যয় যাবেন না! মানুষের অসাধ্য এরপর বুঝি সত্যিই আর কিছু রইল না!”
দেবী তাঁর মুখের সহজাত স্মিত হাসিটুকু ধরে রেখে শান্তভাবেই প্রশ্ন করলেন, “কেন? আবার কী নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছে তারা? কী অসাধ্য নতুন করে সাধন করেছে জ্ঞানপাপী মানুষ?”

নারদ কলসের মসালা কোল্ড ড্রিঙ্কে একটা লম্বা চুমুক মেরে বলে চললেন, “আরে ব্যাটারা কী আশ্চয্যি এক নতুন জিনিস বানিয়েছে দেবী! নাম দিয়েছে থ্রি ডি টেকনোলজি! কোথাও কোথাও তার চেয়েও ক’ধাপ এগিয়ে বানিয়েছে সেভেন ডি, ইলেভেন ডি সব সিনেমা! সেই সিনেমার হলে গিয়ে বসলে আসনসুদ্ধু দর্শক সামনের পরদার ছবির তালে-তালে দোল খায়, পাক খায়! পরদার ছবিতে আগুন লাগলে দর্শকও নিজের আশেপাশে গরম অনুভব করে, পরদায় বরফ পড়লে দর্শকও কেঁপে ওঠে ঠান্ডায়। সেই ছবির পরদা থেকে দর্শকের নাকের সামনে এসে লকলক করে বিষধর সাপের ফণা!”

বীণাপাণি নিজের খোঁপা ঠিক করতে-করতে মুচকি হেসে বললেন, “বুঝলাম। কিন্তু এ আর নতুন কী দেখলেন দেবর্ষি? এমন বিমূর্ত অনুভূতি কি অনেক আগে থেকেই আমরা নিঃশব্দে উপহার দিয়ে রাখিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে?”

নারদ সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অমন মাল্টি ডাইমেনশনাল অনুভূতি? আমরা?? অনেক আগে থেকেই দিয়ে রেখেছি মানুষকে??? কী বলছেন দেবী!”

সরস্বতী হাসিমুখেই নিজের শাড়ির আঁচল ঠিক করতে-করতে উঠে দাঁড়ালেন। অন্দরমহলে ফিরে যাওয়ার আগে দেবর্ষির উৎসুক, জিজ্ঞাসাতুর মুখের দিকে একটা কটাক্ষ হেনে বলে গেলেন, “নতুন বইয়ের নিভাঁজ পাতা কিংবা প্রথম বর্ষার সোঁদা মাটির গন্ধ, প্রথম প্রেমের বুক মোচড়ানো, সন্তানের জন্য মায়ের মন কেমন… এদের কোনওদিনও ডাইমেনশনে মেপে দেখেছেন দেবর্ষি? মাপা সম্ভব?”

বিস্ময়াভিভূত নারদ মুনি অস্ফুটে স্রেফ দুটো কথাই উচ্চারণ করতে পারলেন,

“নারায়ণ! নারায়ণ!”

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s