অঙ্ক (৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)

2000px-Lots_of_math_symbols_and_numbers.svg.png

 

ছোটবেলায় বাবা অঙ্ক করাতে বসত আমাকে নিয়ে। অনেকটা বড় হয়ে যাওয়া অবধিও বাবাই অঙ্ক বুঝিয়ে দিত। বাড়িতে টিউশানিও পড়াত বাবা। এখনও পড়ায়। তা, আমার ছোটবেলায় এই যে আমাকে অঙ্ক করানো, কিংবা আমাদের বাড়িতে পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা যখন পড়াত, তখন বাবাকে বহুবার বলতে শুনেছি, “কোনও একটা অঙ্কের প্রশ্নেই লুকিয়ে থাকে তার উত্তর। অঙ্কটা পড়ে নিয়ে প্রথমেই এক-এক করে লিখে ফেলতে হয় ওতে অলরেডি কী-কী দেওয়া আছে। তারপর আলাদা করে লিখতে/ভাবতে হবে, কোন জিনিসগুলো প্রশ্নে নেই, অর্থাৎ যেগুলো জানতে চাওয়া হয়েছে। যেগুলো অলরেডি বলে দেওয়া আছে, সেগুলো ঠিক-ঠিক ধরতে পারলে তখন খুব সহজেই হদিশ মিলবে না-বলে দেওয়া জিনিসগুলোর।”

ছোটবেলায় ব্যাপারটা খুব মজার মনে হত। সত্যিই তো। অঙ্কের প্রশ্নটা প্রথমবার পড়ার সময় সত্যি তো অনেক কিছু মিস করে যাই আমরা অনেকসময়ই। প্রশ্নে কী-কী বলে দেওয়া আছে, সেটা ঠিক-ঠিক খুঁজে বের করতে পারলে সত্যিই আটকাত না আর একটাও অঙ্ক! এ যেন অদ্ভুত একটা ম্যাজিক! এ যেন অদ্ভুত সেই বাঁশির সুর, যা শুনলে হ্যামলিন শহরের পাল-পাল ইঁদুরের মতো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অঙ্কের উত্তররা প্রশ্নের পিছু নিত, আমার অঙ্কখাতার পাতায়-পাতায়।

এইভাবে বেশ অনেকদিন, অনেকগুলো বড় ক্লাসে ওঠা অবধি অঙ্ককে কাবু করে রাখা গিয়েছিল বেশ। তারপর আস্তে-আস্তে দেখা গেল, ক্রমশ বেরিয়ে আসছে তার হিংস্রতর দাঁত-নখ। মনে রাখতে হচ্ছে ইয়াব্বড়-বড় সব ফরমুলা! বাবার শেখানো সেই ছোটবেলার ট্রিকটা এখনও কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু আমারই হাত কাঁপছে সেই ট্রিক অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে। প্রশ্নে কী-কী বলে দেওয়া আছে, আর কী-কী যে বলে দেওয়া নেই, এই দু’য়ের হিসেব মেলাতে দিন-দিন বেড়েই চলছে হিমসিম।

তারপর একদিন সকালে উঠে রিয়ালাইz করলাম যে খাতায়-কলমে ঘামঝরানো অঙ্ক আমাকে আর করতে হবে না কোনওদিনই। কারণ ততদিনে প্রায় হঠাৎ করেই চাকরি পেয়ে গিয়েছি একটা। অতএব, আর দিতে হবে না অঙ্ক পরীক্ষা। আর মুখস্থ রাখতে হবে না বিচ্ছিরি ফরমুলাগুলো। আর তারপরই শুরু হল আসল মজা।

দেখা গেল, রোজকার জীবনের আনাচকানাচ থেকে প্রায়ই উঁকি মারছে কতশত অঙ্ক। মানুষে-মানুষে কত-না প্রচণ্ড জটিল সব হিসেব। সেই উত্তরহীন অঙ্ক, সেই কখনও না-মেলা হিসেবেরা এসে কাঁধে টোকা দেয়। আর মনে পড়ে যায় বাবার কথাগুলো, “কোনও একটা অঙ্কের প্রশ্নেই লুকিয়ে থাকে তার উত্তর। অঙ্কটা পড়ে নিয়ে প্রথমেই এক-এক করে লিখে ফেলতে হয় ওতে অলরেডি কী কী দেওয়া আছে।”

বাবা-মা-দাদা-বউদির থেকে অনেকদূরের কোনও এক অসম্ভব একলা রাতে, সিগারেটের ধোঁয়ার রিংয়ের ফাঁকে-ফাঁকে, হঠাৎ পাওয়ার কাটে দম ফুরিয়ে মরতে থাকা ফ্যানের ব্লেডের ক্রমশ থেমে যাওয়ার তালে-তালে মনে পড়ে যায় বাবার শেখানো ম্যাজিক ট্রিক। সেই জাদুতে ভরসা রেখে হাত বাড়িয়ে সাহস করে হিসেবের খাতাটা টেনে নিতে যাই। দেখি, হাত কাঁপছে এখনও।

জীবনের অঙ্কের সঙ্গে আমাদের কারওরই কি সত্যিকারের বন্ধুত্ব হওয়া সম্ভব কোনওদিন? সেই অঙ্কে কী-কী দেওয়া আছে জানা হলেই কি পাওয়া যায়, কী চাইছি, তার উত্তর?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s