চিতাবাঘ (২১ অগস্ট, ২০১৬)

leopard-tree-jpg-adapt-945-1

 

জঙ্গলের মধ্যে চিতাবাঘদের একটা আলাদা এলাকা। এই জঙ্গলে বাঘ কিংবা সিংহদের বাস নেই। বেড়াল পরিবারের সদস্য বলতে আছে এই এক চিতাবাঘেরাই। তারাই এ জঙ্গলের রাজা। তাদের ইচ্ছেতেই এই জঙ্গলের বাকি সদস্যরা ওঠে কিংবা বসে।

এক সন্ধেয় চিতাদের সেই ডেরায় ছোট্ট ছোট্ট চিতাবাঘের ছানাদের গল্প শোনাচ্ছিলেন চিতাপ্রবীণ রাখু। জনাপাঁচেক খুদে চিতাকে শেখাচ্ছিলেন চিতা-জীবনের পাঠ,

“আমাদের চিতা-সমাজে বে-থা’র তো বালাই নেই। বস্তুত সমস্ত প্রাণীজগতে একমাত্র প্রাণীশ্রেষ্ঠ মানুষ ছাড়া প্রকৃতি মায়ের আর কোনও সন্তানই সাধ করে বে-থা’র মতো বিচ্ছিরি ঝামেলায় জড়াতে যায় না। তা সে যা হোক, বে অর উইদাউট বে, বাচ্চাকাচ্চা তো হবেই। এইখানে এসে আমাদের এই বেড়াল প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা যায়। আমাদের পুরুষরা বাচ্চাকাচ্চা মোটে দেখতে পারে না কো। সুযোগ পেলেই তারা মেরে ফ্যালে নিজের বাচ্চাদের।”

সামনে বসা চিতা বাচ্চাদের সকলেই ভেবে দ্যাখে, সত্যিই তো। জন্মের পর নিজের মা-মাসিদের সঙ্গেই বেশিরভাগ সময় কেটেছে তাদের। বাবা-কাকাদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ প্রায় হয় না বললেই চলে।

একটু দম নিয়ে, পাশে রাখা ডাবের খোলার জমা জলে জিভ ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন চিতাপ্রবীণ রাখু, “তবে ব্যত্যয় এই দুনিয়ায় সব জিনিসেরই হয়। আমাদের সমাজেও সন্তানের প্রতি জন্মদাতা পিতার এই বিদ্বেষের চিরকালীন গল্প মাত্র একবারই নিজের রূপ বদলেছিল।”

গল্প শোনায় কনিষ্ঠতম চিতা-ছানা পুকলুর উৎসাহই সবচেয়ে বেশি। আধো আধো স্বরে সে তড়িঘড়ি বলে উঠল, “কীলকম? কীলকম? আমিও ছুনব!”

রাখু বলে চললেন, “সে অনেক কাল আগের কথা। এই এলাকায় তখন ছিল আরও গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলেই এক শক্তিশালী সুপুরুষ চিতা বাস করত, যার ছিল একশ সঙ্গিনী। সন্তানাদিও সেই হিসেবে ছিল শয়ে-শয়ে। এবং স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত সন্তানকে তাদের পিতার নজর থেকে বাঁচিয়ে-বাঁচিয়ে রাখত তাদের মায়েরা। এক ঝড়জলের রাতে সেই অমিতবিক্রম চিতাবাঘের সামনে পড়ে যায় তারই এক ছোট্ট পুত্রসন্তান! মাকে আশেপাশে কোথাও খুঁজে না পেয়ে সে যখন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে মরছে এদিক-ওদিক, বজ্রপাতের ঝলকানিতে আচমকাই সে দেখতে পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে তার চেয়ে অন্তত দশগুণ বড় চেহারার তারই পিতা। পিচ্ছিল তার লোমশ দেহ থেকে চুঁইয়ে পড়ছে বর্ষার অবিরাম ধারা। বিদ্যুৎ ঝলকে ঝলসে উঠছে তার হিংস্র শ্বদন্তের ধারালো, নগ্ন অংশটুকু!”

সামনে বসে থাকা বাচ্চারা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে সমস্বরে আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করে, “তালপল??!”

রাখু আরও একবার গলা ভিজিয়ে নিয়ে মৃদু হেসে বলেন, “ওই যে বললাম। ওই একবারই ব্যত্যয় হয়েছিল প্রকৃতির নিয়মের। সেই দুর্যোগের রাতে নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার প্রাকৃতিক তাগিদকে উপেক্ষা করে সেই বীর চিতাবাঘ তাকে সযত্নে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিল তার মায়ের কোলে।”

“কিন্তু কেন? কীভাবে?” রাখুদাদুকে আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়তে দেখে পুকলু অধীর হয়ে জানতে চায়, “কেন সেই লাতে অমন কলেছিল সেই বলো চিতাবাঘটা?”

রাখু তার বয়সের ভারে ন্যুব্জ দেহটাকে একবার ঝাড়া দিয়ে নিয়ে রহস্যময় একটা হাসি হেসে থেমে-থেমে বলেন, “সেই কারণ বলা আছে প্রাণীশ্রেষ্ঠ মানুষের তৈরি এক বিজ্ঞাপনে। যদিও সে জিনিস মানুষ তৈরি করেছিল ওই ঘটনার অনেক-অনেক পরে, ঘটনাটা না জেনেই। মানুষকে প্রাণীশ্রেষ্ঠ তো আর এমনি এমনি বলা হয় না!”

“কী সেই কালোন??” উদগ্রীব হয়ে সমস্বরে জানতে চায় সমবেত চিতা-ছানারা।

রাখু ফিসফিসিয়ে, যেন খুব গোপন কিছু বলছেন, এমন ভাব করে উত্তর দেন,

“কিঁউকি চিতা ভি ‘পিতা’ হ্যায়!”

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s