দুই বোন (৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)

96lflt24gevn

জানো তো, আমার মা চিরকাল আমাদের দুই বোনকে শিখিয়ে এসেছিল, থালা-বাটি এক জায়গায় থাকলে নাকি ঠোকাঠুকি হবেই। উনুনের আগুনে একঘটি জল ঢালো। ছ্যাঁত করে আগুন যাবে নিভে। কিন্তু ওই একঘটি জলই কড়ায় করে উনুনে চাপাও, দু’পক্ষের তরজা চলবে বেশ অনেকক্ষণ। মা বলত, উনুনের আগুন আর কড়ায় চাপানো জলের মাঝে থাকা ওই কড়াখানার নামই নাকি সংসার। উনুনের আঁচ বাড়িয়ে-কমিয়ে, মেনে-মানিয়ে নিয়ে দু’পক্ষই কম-বেশি জিইয়ে থাকাই নাকি দাম্পত্য। টিলুর বাবার সঙ্গেও গোড়া থেকেই তেমনি করেই তো কাটিয়ে দিলেম হোক না হোক আট-আটখানা বছর। ২৯২২ খানা দিন। কম-বেশি ৫০,০০০ ঘণ্টা। দুটো মানুষ একসঙ্গে। কত স্মৃতি… কত যে স্মৃতি! কাল রাতে সেই মানুষদুটোরই একজন চলে গেল।

তাও নিজের ইচ্ছেয় গেল কই? তেমনটা হলে আজ সকাল থেকে এই যে ঘর ভর্তি পুলিশের দল, বাড়ি ভর্তি লোক-লস্কর, পাড়া ভর্তি টিভি ক্যামেরা… এই এতকিছু হত কি? বাড়ির ব্যালকনিতে মাঝরাতে দিব্যি খুন হয়ে গেল মানুষটা? ঘরের মধ্যে থেকে কেউ কিচ্ছুটি জানতে পর্যন্ত পারল না? ছুটির দিনে বেলা করে ঘুম ভেঙে দেখি, মানুষটা বিছানায় নেই। বাথরুমে নেই, টিলুর ঘরে তখনও অকাতরে ঘুমনো টিলুর পাশে নেই, এমনকী একতলায় মা-বাবার শোওয়ার ঘরে পর্যন্ত নেই! তারপর ফের দোতলায় উঠে এসে শেষমেশ ব্যালকনিতে দেখি এই কাণ্ড। কাল যে শার্ট-প্যান্টটা পরে অফিস-ফেরত আমার জন্য অ্যাত্তবড় ফুলের বোকে-টা নিয়ে হাসতে-হাসতে ঘরে ফিরেছিল, সেটাই পরে ব্যালকনিতে রাখা আরামকেদারাটায় ঘাড় এলিয়ে বসে আছে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে সিগারেট খেতে উঠে এসেছিল নিশ্চয়। আর ফিরে যায়নি। মাথার পিছন থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে নীচে মেঝেয় জমাট বেঁধে আছে। চোখদুটো মৃত্যুযন্ত্রণার কালিমা মেখে খোলাই পরে আছে সারা রাত। আততায়ী বুঝি বা ব্যালকনিতেই ঘাপটি মেরে ছিল লুকিয়ে। উফফ…

আমি না, ওই দৃশ্য দেখার পর আজ সকাল থেকে তিন-তিনবার জ্ঞান হারিয়েছি, জানো? যেটুকু সময় জ্ঞান ছিল, চুপচাপ বসে-বসে কেঁদে গিয়েছি। দু’ চোখ বেয়ে জল নেমে এসে অক্লান্ত ভিজিয়েছে আমার গাল, গলা, ব্লাউজ… কী হবে এবার? পাঁঁচবছরের ছোট্ট টিলুটাকে নিয়ে এত লম্বা বাকি জীবনটা একা-একাই কাটাতে হবে? এক্কেবারে একা? নিজের একটা চাকরিও তো আমার…

আচ্ছা, তোমরা বুঝি ভাবছ, এত বড় শোকের সময়েও কী করে এত কথা মনে করে-করে বলছি ঠিক? তাই না? ওমা! কীভাবে কী হল, মনে না করে উপায় কী? সকাল থেকে পুলিশ আর তার চেয়েও বেশি করে মিডিয়াকে বারবার বলতে হচ্ছে না, কাল আমিকখন কোথায় ছিলাম? আমার সঙ্গে আমার স্বামীর সম্পর্ক কেমন ছিল? আমার ছেলে কত বড়? আজ থেকেই যে ওর “বাবা” ডাকে আর কেউ সাড়া দেবে না, তা ওকে জানানো হয়েছে কিনা? আমার শ্বশুর-শাশুড়িও ভেজা চোখে প্রশ্নবাণে অস্থির… আর ওই যে পাশের সোফাটায় বসে আছে ফুটফুটে যে মেয়েটা, দেখছ তো? ও হল গিয়ে আমার আপন মায়ের পেটের বোন ঊর্মি। ফুলে-ফুলে সকাল থেকেই কেঁদে চলেছে ও-ও। কিছু আঁচ করেছে কি? না করলে আমি অবাকই হব, জানো তো? বোনটা তো আমার মতো সহজ-সরল, সাধাসিধে হয়নি একেবারেই। যে কারণেই ছোট থেকেই ওর বদমাইশি বুদ্ধির কাছে আমি হেরে গিয়েছি বারবার।

কলেজে পড়ে মাত্র, তাতেই নিজের জামাইবাবুর সঙ্গে সম্পর্কটায় জড়িয়ে পড়ার আগেও যে কারণে নিশ্চয়ই ভেবেছিল, ওর বোকাসোকা দিদিটা কোনওদিনই জানতে পারবে না বুঝি। কিন্তু ক’দিন সব জেনেও কিচ্ছু না জেনে থাকতে পারে গো কেউ? বোকা হতে পারি, কিন্তু নিজের স্বামীর মন বুঝব না? এমনকী আমাদের বিবাহবার্ষিকীর রাতেও অফিসফেরত ওর জামায় লেগে থাকা বেআইনি লম্বা চুলগুলোও খেয়াল করব না? এই একটা দিনেও? ছিঃ! অনেকদিন ধরেই যে ব্যাপারটা বুঝেও না বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছি এতদিন, কাল রাতে বাড়িসুদ্ধ সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর যখন ও এল, তখন ওর জামায় লেগে থাকা আমার ওই অপমানটারই হিসেব চেয়েছিলাম। আমাকে পাগল অপবাদ দিয়ে খুব একচোট হম্বিতম্বি করে ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট নিয়ে বসেছিল। বোকে-টা ছুঁড়ে ফেলেছিল ঘরের একপাশে। আমিও ঠিক তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম জানো, ঊর্মিকে আমি জিততে দেব না। কিছুতেই না। আটবছর সংসারের জোয়াল টানা বহ্নি অনেকবার হেরেছে নিজের বোনের কাছে। আর নয়।

আচ্ছা, পুলিশ কি আমাদের রান্নাঘরটাও সার্চ করবে গো? করে ওরা? বোকেটা সেই কাল রাতেই ফুলদানিতে তুলে রেখে দিয়েছি। কিন্তু রান্নাঘরের এক্কেবারে নীচের তাকে রক্তে মাখা শিলনোড়ার নোড়াটা ধুয়ে-মুছে চকচক করে যে রেখে এসেছি, পাবে ওরা ওটা খুঁজে? কী গো? পাবে ওটা?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s