পালটে যাবে… (৩০ অগস্ট, ২০১৬)

sri-krishna-3d-wallpaper-1920x1080.jpg

 

সকাল থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দুই বিজ্ঞানী। যে অদ্ভুত, আশ্চর্য আবিষ্কারের নেশায় গত সহস্রাধিক বছর ধরে একাগ্রচিত্তে কাজ করে চলেছেন তাঁরা তিন মূর্তি, কিন্তু পারছেন না কিছুতেই শেষ অঙ্কটুকু মেলাতে, অবশেষে আজ মিলতে পারে তার উত্তর। অন্তত ড. মধুসূদন ঘোষাল তো সেরকমই আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন তিনসপ্তাহ আগে।

প্রাণসৃষ্টির কাজে অনেক বছর আগেই সাফল্য পেয়ে গিয়েছেন তাঁরা। শুরুটা হয়েছিল কৃত্রিমভাবে এককোষী প্রাণ সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ দিয়ে। আদ্যপ্রাণী তৈরির প্রথম সেই রাতের উত্তেজনা আজও নিজের চার সিপিইউ-ওয়ালা কম্পিউটারের একটিতে স্টোর করে রেখেছেন ড. সদানন্দ ব্রহ্মা। তারপর একে-একে ড. ব্রহ্মার বানানো প্রোগ্রাম অনুযায়ী বিজ্ঞানের নিয়মেই একের পর এক তৈরি হতে থেকেছে উন্নততর, বহুকোষী প্রাণী। তৈরি হয়েছে মেরুদণ্ডী প্রাণী, তৈরি হয়েছে মানুষও। কিন্তু…

নিজের পাইপে একটা লম্বা টান মেরে গবেষণাগারের ভিতরটা ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় ভরিয়ে দিলেন ড. মহেশ্বর পূততুণ্ড। অধৈর্যভাবে একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি। বেলা বারোটা বাজতে চলেছে, এখনও তো এলেন না ড. ঘোষাল! সেই তিনসপ্তাহ আগে গরুড় ব্র্যান্ডের নিজের গাড়ি নিয়ে সেই যে ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে গেলেন আর বলে গেলেন, তিনহপ্তার মধ্যেই সমস্যার সমাধান নিয়ে ফিরে আসবেন, তারপর আর কোনও খোঁজখবরই নেই তাঁর! সমস্ত কাজ সারা, স্রেফ একটা ছোট্ট অঙ্ক কেউ মেলাতে পারছেন না আজ হাজার বছর হতে চলল! কিছুতেই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না এমন এক গুণের, যা তাঁদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে করে তুলবে অনন্য, একমেবাদ্বিতীয়ম! যার জন্যই মানুষ হয়ে উঠবে অন্য সমস্ত জীবের তুলনায় শ্রেষ্ঠ!

অবশেষে বিকেল পাঁচটার দিকে ঝড়ের বেগে ল্যাবে এসে ঢুকলেন ড. ঘোষাল। উদভ্রান্তের মতো তাঁর চেহারা, উসকোখুসকো চুল, নীলাভ তাঁর সারা গায়ে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট!

“পাওয়া গিয়েছে? পেয়েছেন সমাধান ডক্?” ড. সদানন্দ উত্তেজিত ভাবে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন ড. ঘোষালের দিকে।

ড. ঘোষাল একটু দম নিয়ে প্রথমে ল্যাবের টেবিলের উপর রাখা জলের গ্লাস থেকে ঢকঢক করে জল খেলেন গ্লপ-গ্লপ শব্দ করে। তারপর হাতের চেটোয় মুখ মুছে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে বললেন, “আরে আর বলবেন না ডক্! আমার পুষ্যি শেষনাগের কথা জানেন তো নিশ্চয়ই? সে ব্যাটার কাল মাঝরাত থেকে মারাত্মক শরীর খারাপ! সমস্ত রাত আমি আর মিসেস সেই নিয়ে দৌড়োদৌড়ির একশেষ… তাও তো ভোরবেলার দিকে ঘুরতে-ঘুরতে মিস্টার নারদ আমাদের বৈকুণ্ঠপাড়ার দিকে গিয়েছিলেন… উনিই তারপর লোক-টোক ডেকে… এই করতে গিয়েই এতখানি দেরি হয়ে গেল! আই অ্যাম ভেরি ভেরি সরি! আসলে শেষ তো শুধু আমার পুষ্যি নয়…”
ড. পূততুণ্ড এতক্ষণে নেশার ভারে আচ্ছন্ন নিজের তিন-তিনখানা লাল চোখ বড়-বড় করে ইন্টারাপ্ট করতে বাধ্য হলেন, “কিন্তু আমাদের ইকোয়েশনের সলিউশনটা? সেটার কি কোনও সুরাহা করতে পেরেছেন আপনি?”

পকেট থেকে ময়ূরপুচ্ছ ছাপ দেওয়া রুমালটা বের করে মুখ মুছে বললেন ড. ঘোষাল, “ওহ! সেইটা? সে তো সেই কবেই সলভ করে ফেলেছি। এই ক’দিনের ব্যস্ততায় আপনাদের জানানো হয়নি, সরি!”
“মানে?!” প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে নিজের ত্রিফলা ওয়াকিং স্টিকে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ড. পূততুণ্ড, “আপনি সমাধান পেয়েও বাড়িতে বসে ছিলেন এতদিন চুপচাপ? আর এদিকে আমরা যে চিন্তায়-চিন্তায় প্রায় আধমরা হতে বসেছি, সে কথাটা আপনার মাথায় এল না একবারও?”
“কাম ডাউন ডক,” পরিস্থিতির গাম্ভীর্য হালকা করতে চেয়ে বাধা দিলেন ড. ব্রহ্মা, “আগে সমাধানটা শোনা যাক! খামোখা একে অন্যের উপর খাপ্পা পরে হওয়া যাবে খন! আপনি বলুন ড. ঘোষাল, কী সমাধান খুঁজে বের করেছেন আপনি?”

ড. মধুসূদন ঘোষাল নিজের ট্রেডমার্ক স্মিত হাসিটা হেসে হাতের আঙুল দিয়ে মাথার কুচকুচে কালো চুলগুলো একবার সামলে নিয়ে শান্তভাবে বললেন, “এমন একটা গুণ, যা মানুষকে করে তুলবে অন্য সব জীবের চেয়ে আলাদা, সর্বশ্রেষ্ঠ, তাই তো? এই তো ছিল রিকোয়্যারমেন্ট?”
বাকি দু’জন অসম্ভব কৌতূহলী হয়ে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ! পাওয়া গিয়েছে অমন কোনও গুণের খোঁজ, যা আমরা প্রোগ্রাম করে ঠেসে দিতে পারি আমাদের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টির পেটে? পাওয়া গিয়েছে?”

মধুসূদন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হুম। মানুষের বিশেষত্ব এটাই হবে যে, সে চিরকাল থাকবে না একরকম! সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে পালটে-পালটে যাবে তার মনন, স্বভাব, বিচার-বুদ্ধি, সবটাই। আর পালটে যাবে বলেই সেরা হবে সে। আবার পালটে যাবে বলেই হবে বিচ্ছিরি। অন্য সব প্রাণীর চেয়ে স্বতন্ত্র হবে তার এই গুণ। আজ যে পুরুষকে দেখে প্রেমে পাগলপারা হবে কোনও নারী, কাল হয়তো সেই পুরুষেরই পালটে যাওয়া দেখে কান্নায় ভেঙে পড়তে হবে তাকে। আবার আজ যে পুরুষ পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করবে তার প্রেয়সীর কাছে, “পালটে যাব আমি ঠিক, ভাল রাখব তোমায়,” ভালবাসা সত্যি হলে একদিন সত্যি… সত্যিই পালটে যাবে সে।”

একসঙ্গে দু’জনেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ড. ব্রহ্মা আর ড. পূততুণ্ড। মধুসূদনের এই প্রস্তাবে সায় দিতে মন চাইছে না তাঁদের কারওরই। আবার প্ল্যানটা এমনই খাসা যে মেনে না নিয়ে সত্যিই কোনও উপায়ও নেই। ডক্টর ঘোষাল চিরকাল ঠিক এমনটাই। সেজন্যেই তিনি বেস্ট। বরাবরের।

নিস্তব্ধ ল্যাবরেটরির সমস্তটা জুড়ে ছেয়ে রইল ড. মহেশ্বরের পাইপের একরাশ ধোঁয়া আর অনেকটা অনিবার্য বিষণ্ণতা… অন্ধকার ঘরে শুধু ঘুরপাক খেতে থাকল ড. ঘোষালের কথাগুলো, ‘পালটে যাবে… পালটে যাবে বলেই সেরা হবে সে। আবার পালটে যাবে বলেই হবে বিচ্ছিরি…’

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s