খাদ্যরসিক বটুক (২২ এপ্রিল, ২০১৬)

 

be392c9cf03a981e6270b770414ac20f-d4ko28vবটুক ভারী খেতে ভালবাসে। এ নিয়ে তার কোনও সংকোচ নেই। কোনও লাজলজ্জার তো প্রশ্নই নেই। ভাল লাগে খেতে, তাই খায়। কারও হয়তো সারাদিন পড়ে-পড়ে ঘুমোতে ভাল লাগে। কেউ আবার খুশি খুঁজে পায় যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোয়। তা, সেসব নিয়ে কি কখনও লজ্জা পায় তারা? তবে বটুক কেন পাবে? চুরিচামারির মতো গর্হিত কোনও কাজ তো আর করে না রে বাবা! একটু খেতেই যা ভালবাসে ছেলে। কীরকম সেই ভালবাসা? তা, বটুক আমাদের, পারলে সারাদিনই মুখ চালায়। ঈশ্বরের কৃপায় জন্মে ইস্তক মুখের সামনে সময় মতো ভালমন্দ খাবারের কোনওদিন অভাব হয়নি বটুকের। কতকটা সেই কারণেই বটুকের অভ্যেসই হয়ে গিয়েছে দিনভর মুখ চালিয়ে যাওয়ার।

বটুকের অবশ্য নিজের কোনও বাড়ি নেই। তার এলাকার আরও গোটাকুড়ি ভবঘুরের মতোই সেও ঠাঁই পেয়েছে এপাড়ার খ্যাপা বিজ্ঞানী প্রদ্যোত ভট্‌চাযের বাড়িতে। প্রদ্যোতবাবু বিজ্ঞানের মানুষ। পিতৃদত্ত বিশাল বাড়িখানায় রাত-দিন এক করে চেষ্টা করে চলেছেন নতুন কিছু উদ্ভাবন করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার। তা, বিজ্ঞানী মানুষ। ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বিজ্ঞানীর আর করণীয়ই বা কী! চেষ্টায় তাই কোনও দোষ নেই। কিন্তু প্রদ্যোতবাবুর ক্ষেত্রে সমস্যা একটাই। তাঁর চেষ্টাটা চলছে আজ প্রায় বছর কুড়ি হতে চলল। তুলনায় ফলাফল কিন্তু সেভাবে চোখে পড়েনি আজও। এই কুড়ি বছরে বটুকের আশ্রয়দাতা যে একেবারে কিছুই বানাতে পারেননি, তা অবশ্য নয়। তবে তার কোনওটা দিয়েই মনুষ্যকুলের সেভাবে কিছু উন্নতিসাধন হয়নি।

সে যাহোক, কথা হচ্ছিল বটুককে নিয়ে। প্রদ্যোতবাবুর আশ্রয়ে গত তিন-চারবছর রাজার হালেই কেটে যাচ্ছে বটুকের। নতুন জায়গায় এসে… সত্যি বলতে কী… একটু-আধটু ভাব-ভালবাসাও হয়েছে সম্প্রতি, ভেবলির সঙ্গে। ভেবলিও এবাড়ির আশ্রিতদের মস্ত বড় দলটার ছোট্ট একটা অংশ। তবে বটুকের জীবনে তার জায়গা কক্ষনও ছোট্ট নয়। বরং খাওয়া ছাড়া ইদানীং আর যে একটাই জিনিসে মন দিতে ইচ্ছে করে বটুকের, তা হল ওই ভেবলি। ওকে নিয়ে নিজের মনের উথালপাথালের কথা এখনও মুখ ফুটে ভেবলিকে বলে উঠতে পারেনি বটুক। তবে সে লক্ষ করে দেখেছে, আশপাশের ছেলে-ছোকরারা মাঝে-মাঝেই যখন বটুককে ‘পেটুক বটুক, মোটকু বটুক’ বলে হাসি-ঠাট্টা করে, ভেবলি কিন্তু কক্ষনও অংশ নেয় না সেইসব বিচ্ছিরি হাসি-মশকরায়!

সে যাহোক ভেবলির প্রসঙ্গ, কথা হচ্ছিল বটুককে নিয়ে। আজ সোমবার, সময় দুপুর দুটো। বাড়ির সামনের উঠোনে একটা কাঁঠাল গাছের ঠান্ডা ছায়ায় বসে একটা বই গোগ্রাসে গিলছিল বটুক। কাল প্রদ্যোতবাবুর ঘরের বাইরে বইটা কুড়িয়ে পেয়েছে সে। প্রায়শই পাওয়া যায় এমন। এই বইটার নাম ‘ক্যাবলা মেসো’ না কী যেন বেশ! তবে নামটা অদ্ভুত হলেও বইয়ের পাতায়-পাতায় এমন আকর্ষণ… তার টানেই গত আধঘণ্টা বটুক জগত্‌সংসার ভুলে মন দিয়েছে ওতেই। কিছু একটা নিয়ে তো ভুলে থাকা যাচ্ছে মন খারাপটা!

মন খারাপ হবে না? সেই যে গতকাল দুপুরে প্রদ্যোতবাবু আর বাড়ির কাজের লোক গণশা এসে ভেবলির সঙ্গে কী যেন কথাবার্তার পর ওকে নিয়ে গেল নিজেদের সঙ্গে? সেই থেকে ভেবলিকে আর দেখতে পায়নি বটুক। বাড়ির ভিতরমহলে বটুকদের ঢোকা বারণ। মনটা তাই উদাস হয়ে আছে সকাল থেকেই। ভিতরবাড়িতে কাল রাতে খুব ভাল রান্নাবান্না হয়েছে। একটা খুব সুস্বাদু নতুন ধরনের খাবার, যা এবাড়িতে আগে কখনওই হয়নি বোধহয়, তার গন্ধে ম-ম করছিল চারদিক। অন্যদিন হলে বটুকের মন পড়ে থাকত ওই খাবারের দিকেই। আজও… সত্যি বলতে কি… মনটা একটু-একটু ওদিকেও আছে বটে, তবে ভেবলির জন্য মন-কেমনটাও আছে পুরোদস্তুর!

বইটা প্রায় শেষ করে এনেছে বটুক, এমন সময়ে ভিতরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন প্রদ্যোতবাবু। সঙ্গে তাঁর ভৃত্য কাম রাঁধুনি, গণশা। আবার! আবার সেই খাবারটার গন্ধে ভরে উঠেছে চারদিক। গণশা বটুকের সামনে এসে একটা বাটিতে করে খানিকটা সেই খাবারটাই এগিয়ে দিল বটুকের দিকে। কী এটা? ভাত? উঁহু! সঙ্গে মাংসও মেখে দেওয়া আছে মনে হচ্ছে। কিন্তু মাংস তো খায় না বটুক। মাংসের টুকরোটার ছোঁয়া বাঁচিয়ে সুগন্ধী ভাতটা গপগপ করে খেতে শুরু করল সে।

গণশা এতক্ষণে জিজ্ঞেস করল, “বাবু, মাংসটা ও খাবে? এও কি সম্ভব?”

প্রদ্যোতবাবু জবাব দিলেন, “গণশা, তোকে আগেও বলেছি, ‘ছাগলে কি না খায়’, কথাটা অর্ধসত্য! কিন্তু আমার আবিষ্কার করা যে ওষুধটা আমি ওই মাটন বিরিয়ানিটায় মিশিয়ে দিয়েছি, তাতে করে ভেবলিকে কেটে রান্না করা ওই মাংসই বটুক খাবে। খাবেই! তুই শুধু সবুর কর। পৃথিবীর বুকে প্রদ্যোত ভট্‌চাযই প্রমাণ করে যাবে ছাগলের সব খাওয়ার থিয়োরি! প্লাস, এক ঢিলে দুই পাখি মেরে ক্যানিবালিজ়ম প্রমাণ করার ব্যাপারটা তো আছেই। ক্যানিবালিজ়ম বুঝলি তো? সেই যে তোকে বলছিলাম…”

দুপুর-রোদে মাটন বিরিয়ানি খেতে ব্যস্ত বটুক নামের পূর্ণবয়স্ক সুপুরুষ একটি পাঁঠার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন খ্যাপা বিজ্ঞানী প্রদ্যোত ভট্‌চায আর তার পরিচারক গণশা। একটু পাশে পড়ে রইল বটুকের আধখাওয়া একটা বই। এই মুহূর্তে যার মলাটটা উড়ে-উড়ে যাচ্ছে দুপুর রোদের গরম হাওয়ার হলকায়। যার উপর জ্বলজ্বল করে লেখা বইয়ের বিষয়বস্তুর নাম, ‘ক্যানিবালিজ়ম’।

Advertisements

6 thoughts on “খাদ্যরসিক বটুক (২২ এপ্রিল, ২০১৬)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s