হবেই তো (৫ জানুয়ারি, ২০১৭)

শোনো মেয়ে, রাত বারোটার সময় তুমি ছোট পোশাক পরে রাস্তায় বেরবে, একটু হয়তো মদও খেয়ে বা না-খেয়ে থাকবে, উৎসবমুখর হাজার-হাজার মানুষের ভিড়ের অংশ হয়ে উঠতেও চাইবে, আর তারপর কোনও এক সুপুরুষ কাপুরুষ ভিড়ের সুযোগে তোমায় একটুখানি ছুঁতে চাইলেই দোষ?

“আরেবাবা রেপ তো করে দেয়নি!”
বটেই তো। সামান্য একটু ছুঁয়েই তো দিয়েছে। বড়জোর তোমার কাপড় ধরে টান মেরেছে। ছিঁড়ে ফেলে দেখতে চেয়েছে তোমার শরীরের একটুকরো ঝলক। ত্তো? তুমি যে নিজে থেকে এট্টুখানি স্কার্ট আর ক্রপ টপে নিজেকে আধখানা উন্মুক্ত করেই আসরে এসেছিলে, তার বেলা? এই পরিষ্কার বলি মেয়ে, শুনে রাখো। তোমার মা নিশ্চয়ই আমার মায়ের মতো আদরেই তোমাকে মেখে খাইয়ে দিয়েছেন ভাত। কিন্তু কেন তিনি তোমাকে শেখাননি সাবধান হতে, কেন শেখাননি পার্লারে গিয়ে আইব্রো তুমি যেমনই সাজাও, সবার আগে তোমার আব্রু। তুমি, যে কিনা মেয়েমানুষ।

ছেলেমানুষ আর পুরুষমানুষ
আমাদের দুটো আলাদা বয়সকে বোঝাতে কী সুন্দর দুটো আলাদা শব্দ আছে, খেয়াল করেছ মেয়ে? তোমার জন্য যে অমন নেই, বরং বরাদ্দ একটাই শব্দ, ‘মেয়েমানুষ’, কেন খেয়াল করোনি কোনওদিন? একই বাড়ি থেকে একসঙ্গে টিউশন পড়তে বেরবে তুমি আর তোমার ভাই। কখনও ভাবোনি, কেন ভাই রেডি হয়ে নিলেই সাইকেল সমেত বেরিয়ে পড়তে পারে। অথচ বেরনোর আগে তোমাকে কিন্তু আলাদা করে মা সাবধান করে দেন, ‘সাবধানে যাবি, রাত করবি না, ছেলেদের সঙ্গে একা থাকবি না।’ কেন তখনই ভাবোনি, কই, ভাইকে তো মা একবারও বলল না, ‘কোনও মেয়েকে একা দেখলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বি না!’ ভাবোনি, কারণ তুমিও মেনে নিয়েছ যে মেয়েমানুষ হওয়ার অপরাধে তোমারই দায়িত্ব নিজের ‘পবিত্রতা’ রক্ষার। খবরের কাগজে ধর্ষণের খবর পড়ে শিউরে উঠেছ তুমিও। ওই যে ওই শিউরে ওঠার মুহূর্তটা, ওই মুহূর্তে তুমি নিজেও মেনে নিয়েছ, ধর্ষণ মানেই একটা মেয়ের জীবন শেষ হয়ে যাওয়া। ধর্ষক আদৌ ধরা পড়বে কিনা, পড়লেও তার শাস্তি হবে কিনা, হলেও সেটা কতদিনে হবে, এই কথাগুলো জানো তো মেয়ে, কেউ জানে না। কিন্তু ধর্ষিতা মেয়েটির গায়ে যে কলঙ্কের কালি লেপে গেল সারাজীবনের মতো, সেকথা না-চাইতেও স্বীকার করে ফেলবে তুমিও, সে কথা বিলক্ষণ জানি।

1-3

ওরকম হয়েই থাকে
অমিতাভ বচ্চনকে ভগবান ব্যারিটোন দিয়েছেন। তোমায়-আমায় দেননি। এই নিয়ে কি নালিশ করা সাজে? কাকে করবে নালিশ? কেনই বা করবে? ওঁর আছে, তোমার নেই, সিম্পল। ব্যাপারটা মেনে নেওয়া ছা়ড়া অন্য কোনও উপায় আছে কি? ঠিক তেমনই তুমি যে মেয়ে হয়ে জন্মেছ, এটা তোমায় মেনে নিতে হবে। হবেই। মেনে নিতে হবে যে ‘মহিনে কে উন দিনো’-র জন্য লজ্জায় কুঁকড়ে থাকতে হবে তোমাকেই। অসহ্য পেট ব্যথায় গুটিয়ে এতটুকু হয়ে গেলেও পুরুষ সহপাঠী কিংবা সহকর্মীকে বলতে নেই, তোমার শরীর খারাপ। পাগল! বাঘকেই কেউ রক্তের গল্প বলে না! আর এ তো সিংহ হে! পুরুষসিংহ। আর এই যে তোমায় একটু ছুঁয়ে দিয়েছে কেউ, কেউ বা অবাঞ্ছিতভাবে স্পর্শ করেছে তোমায়, এতেই বা আশ্চর্য হওয়ার কী আছে শুনি? পাকা ফলে একটু-আধটু ঢিল পড়বে না? নির্বাচিত এক জনপ্রতিনিধি তো ঠিকই বলেছেন, ‘চিনি ছড়িয়ে থাকলে পিঁপড়ে তো আসবেই’! আর-একজন বলেছেন, ‘এরকম তো হয়েই থাকে।’ তুমি, মেয়ে, ওঁদের এই কুচিন্তিত বক্তব্যগুলোয় যুক্তির এতটুকু ফাঁক দেখাও দেখি!

অনেক ভাল আছ
তাও তো এদেশে আছ হে। হেসেখেলে লেখাপড়া করছ, চাকরিবাকরি, পার্টি-শার্টি, সিনেমা-টিনেমা, ফেসবুক, ইউটিউব সবটাই উপভোগ করছ প্রাণভরে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের মেয়েদের খবর রাখো? কিংবা ধরো সিরিয়ায়? আফগানিস্তানে? বা আইএস-এর হাতে বন্দি বাচ্চা মেয়েগুলো? জানো ওদের কথা? স্বামী বাড়ি ছিলেন না, বউ বোরখা-টোরখা পরে একাই বাজার করতে বেরিয়েছিলেন। ত্তো? বোরখা পরলেই বুঝি সাত খুন মাফ? স্বামীকে ছাড়া মেয়েমানুষ একা পথে বেরলই কোন সাহসে? অতএব চালাও গুলি, ওড়াও মাথা। তা, ওসবের তুলনায় এদেশ তো তোমাদের জন্য বেহেশ্‌ত গো মেয়ে! রাত একটায় চাকরি করে বাড়ি ফেরার পথে কোন ছেলে তোমাকে একটু ইয়ে করেছে বলে গায়ে ফোসকা প়ড়ছে বুঝি? কিন্তু এই উদার দেশে আছ বলেই যে রাত একটা অবধি চাকরি করতে পারছ, এই সহিষ্ণু দেশে আছ বলেই যে পরদিন সকালে থানায় গিয়ে এফআইআর করতে পারছ, এই ডিজিটাল দেশে আছ বলেই যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে ট্রেন্ডিং পোস্ট লেখার সুযোগ পাচ্ছ, সেকথা তো একবারও বলছ না! এদেশে আছ বলেই না প্রেমে পড়ছ, প্রেম করছ, না-পোষালে ভেঙেও দিচ্ছ। পরিবর্তে কখনও-কখনও (এই অবধি পড়ে কে একজন ‘প্রায় রোজদিনই’ বলে চেঁচাতে যাচ্ছিল, তার মুখ আপাতত চেপে দেওয়াই শ্রেয়!) ব্যর্থ কাপুরুষমানুষ তোমায় স্নান করিয়ে দিচ্ছে অ্যাসিডে, কখনও বিয়ের পর পণ না পেয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছে ছাদ থেকে, কখনও তুমি নিজের মা-বাপকে ছেড়ে এসে তার সংসারের সমস্ত দায়িত্ব মুখ বুজে মেনে নিলেও সে এমনি-এমনিই, নেহাত মজার ছলে মদ খেয়ে পিটিয়ে ছাল-চামড়া তুলে নিচ্ছে তোমার! ত্তো? গা-ভরতি কালশিটে নিয়ে, গালভরতি পোড়া দাগ নিয়ে, বুক ভরতি কান্না নিয়ে, মেয়ে তোমরা, বেঁচে তো আছ!

তোমারই দোষ
অতএব মেনে নাও। কারণ এই সময়ে দাঁড়িয়ে, এই ২০১৭-র শুরুতেও তোমার মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। উপায় নেই নিজেই সাবধান হওয়া ছাড়া। উপায় নেই বেঙ্গালুরুর মতো ঝাঁ-চকচকে শহরের রাস্তাতেও রাতে নিশ্চিন্তে বেরনোর। উপায় নেই দিল্লির মতো দেশের রাজধানী শহরে উৎসবের রাতে নির্ভয়ে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে যাত্রীহীন বাসে ওঠার। উপায় নেই কলকাতার মতো শহরে সুজেট জর্ডান নাম্নী দেহোপজীবিনী হওয়ার পরেও নিজের কোনও ইচ্ছে রাখার। বাসে-ট্রামে পা ফাঁক করে বসার হুকুম নেই। ছেলেদের সঙ্গে বসে নেশা করার অনুমতিটুকু আছে, তারপর সেই ছেলেরাই তোমার কোনও ক্ষতি করলে ট্যাঁ ফোঁ করার আইন নেই। মাসিকের কথা ফিসফিসিয়ে বলা ছাড়া গতি নেই, পঁচিশের পরও বিয়ে-থা না করে আইবুড়ো হয়ে বসে থাকার নিয়ম নেই, এমনকী এদেশের কোনও-কোনও মন্দিরে/পুজোমণ্ডপে স্রেফ তুমি মেয়ে, এই অপরাধে ঢোকারও উপায় নেই!

কিন্তু
মেয়ে তুমি মেনে নাও বটে এইসব। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মকে মানতে দিয়ো না প্লিজ়। অনেক-অনেক বছর ধরে মেয়েদের অনেককিছু শেখানো হয়েছে। এবার তুমি মেয়ে, নিজেই শেখাও নিজের/পরের বাড়ির বাচ্চা ছেলেটিকে, সে যেন মেয়েমানুষকে ‘মানুষ’ ভাবতে শেখে। যাকে ইচ্ছে হলেই পাওয়া যায় না। জোর করে যাকে ছোঁওয়া যায় না। নিজের আনন্দের জন্য যাকে আঘাত করা যায় না। শুধু দুর্গাপুজো বা কালীপুজো, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতীপুজোর দিনগুলোতেই নয়, বছরের সব দিনগুলোই জোড়হস্তে প্রণাম করা উচিত যাকে। যে কতটা কাপড় গায়ে রাখবে, সেটা একেবারেই তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। প্রকাশ্যে ধূমপান করবে, নাকি চারদেওয়ালের ঘেরাটোপে, সেটাও।

খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ছেলেকে শেখাও, মেয়ে। কোনও এক শীতের দুপুরে মা-ছেলেতে রোদে পিঠ রেখে তারপর শেখাও ওদের,
“আসলে কী জানিস তো খোকা, ছেলেরা জানে, মেয়েদের নখের যুগ্যি পুরুষ কোনওদিন ছিলই না। তাই তো ওদের এত রাগ মেয়েদের উপর। এত কষ্ট দিতে চায় ওরা মেয়েদের, ওই রাগ থেকেই তো। তুই কিন্তু অমন পুরুষমানুষ হবি না কোনওদিন খোকা। এই তোকে আমার দিব্যি রইল, মনে রাখিস…”

Advertisements

18 thoughts on “হবেই তো (৫ জানুয়ারি, ২০১৭)

  1. I loved this Achyut da, this is incredible, I wish this inspires society in a good way..It was referred by sayak da, thanks to him also, god bless all, and a happier year to you! 😇

    Liked by 1 person

  2. আপনার লেখাটা পরে খুব ভালো লাগলো ! এরম আরো লেখার অপেক্ষায় থাকলাম! All the best 🙂

    Like

    1. অনেক ধন্যবাদ! তুমি কি মালদা-র মেয়ে? আমার বাড়িও মালদায়। চাকরিসূত্রে কলকাতায় থাকি 🙂

      Like

      1. হ্যা । মালদা টাউন-এ বাড়ি। হলি চাইল্ড থেকে পড়াশোনা তারপর রবীন্দ্র ভারতী। সবে বিয়ে হয়েছে বীরভূমে,বরের রিসার্চের জন্য আমেরিকা পারি দিয়েছি। তোমার সাথে আলাপ বেশ ভালো লাগলো 😀

        Like

      2. বাহ এ তো দারুণ ব্যাপার 🙂 আমারও মালদা টাউনেই বাড়ি। শ্রীশচন্দ্রে প্রাইমারি, তারপর বিবেকানন্দ স্কুল। তারপর যাদবপুর ইউনিভার্সিটি। 🙂

        Like

  3. তোমার সাথে আলাপ করে খুব ভালো লাগলো পাপাই ,মালদা গেলে যোগাযোগ করা যাবে, ভালো থেকো, আর খুব ভালো লেখো 🙂

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s