।। অচ্যুত : আমার চোখে ।। (২০১৩)

mahabharat

“ন মে পার্থাস্তি কর্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন ।

নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত এব চ কর্মণি ।।”

(“পার্থ, ত্রিলোকে আমার কিছুই কর্তব্য নেই, অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্যও নেই, তথাপি আমি কর্মে নিযুক্ত আছি ।”)

কোটেশনটা ভালই দিয়েছিল, কিন্তু তা বাদে ‘মহাভারতে তোমার প্রিয় চরিত্র’ নিয়ে লিখতে বসে অবধি বাকি লেখাটা আগাগোড়াই বড্ড বাজে লিখছিল রে, বড্ড বাজে! ধ্যাষ্টামোটা অনেএএএকক্ষণ সহ্য করার পর একটা সময় সত্যিই আর পারলাম না, জানিস? ত্রিকালজ্ঞ হয়েছি, এর-ওর-তার সক্কলের মন আর মাথা যে কোনও মুহূর্তে হাসতে-হাসতে পকেটে পুরে ফেলতে পারি, আর তোদের এই বালখিল্য পুঁচকেটার লেখাটা কব্জা করতে পারব না? শেষ অবধি আর থাকতে না-পেরে তাই ওর লেখাটা নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়াই মনস্থির করলাম। ঠিক যেমন করে তোদের ওই মহাকাব্য মহাভারতের সমস্ত ঘটন-অঘটনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম এককালে!

অন্যের সমালোচনা ব্যাপারটা তোরা বাঙালিরা যতটা মনপ্রাণ দিয়ে করিস, তত আকুল হয়ে তোদের ওই রামকৃষ্ণও বোধহয় কালীকে ডাকেনি। লক্ষ্মীকে কি মাঝে-মাঝে সাধে বলি, অলিম্পিকে সমালোচনার ইভেন্ট থাকলে বাঙালিগুলো এক-একবারে গোটা পাঁচ-দশ মেডেল নিয়ে বাড়ি ফিরত! সমালোচনার সে অ্যায়সা বহর, ভগবানকে অবধি তোরা ভগবান জ্ঞান করিস না। হ্যাঁ!! কদ্দুর আস্পদ্দা! পি কে নামের একখানা ছবি বানিয়ে ঈশ্বরের কাজকর্ম নিয়ে হেসে সকলে কী কুটিপাটি! সিনেমাহলের সিসিটিভিতে চোখ রেখে দর্শকদের রিঅ্যাকশনে উঁকি মারলে রাগে ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে যায়! আজ এই একখানা সুযোগ পেয়েছি। মহাভারতে আমার কূটনীতি নিয়ে তোদের বহু সমালোচনা বহুদিন মুখ বুজে শুনেছি আর মুচকি হেসে পা দুলিয়েছি বৈকুণ্ঠে! কিন্তু আর নয়! দেশে অচ্ছে দিন এসে গিয়েছে, প্রাণ খুলে কথা এবার দেবতারাও বলবে! গায়ের ঝাল আচ্ছা সে আজ হামি ভি ঝেড়ে যাবে। তারপর কথা বলতে আসিস শালারা!

এ ছোঁড়ার কোটেশন দিয়েই যখন লেখাটা শুরু হতে দিয়েছি, এর ব্যবহার করা আরেকখানা কোটেশন দিয়েই আমার বক্তব্য শুরু করা যাক! কোটেশন না দিলে নাকি লেখা জমে না? মাধ্যমিকে স্টার, বক্তৃতার মুখে আগুন জোটে না। যাই হোক, কোটেশনটার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, কাজ করে যাও, কাজ করে যাও, ফলের আশা কোরো না। আজকের এই ‘টাকা ধর্ম, টাকা স্বর্গ, টাকা হি পরমং তপঃ’ যুগে বসে তোদের কাউকেই যে বা যারা এমন কথা বলার দুঃসাহস দেখাবে, নিঘ্ঘাত উদুম প্যাঁদানি খাবে। কিন্তু কথাটা যখন হচ্ছে আমাকে নিয়ে, তো আমার জীবনের আদর্শ বল, আমার brand-এর tagline-ই বল, ছিল ঐ। নিন্দুকে বলে আমার নাকি নিজেকে নিয়ে সাংঘাতিক রকমের fantasy ছিল। আমি মানি না। charm বল, X-factor বল, সে কি আমার ছিল না? নিঃসন্দেহে ছিল, একশোবার ছিল! তা না হলে কি আর এমনি-এমনি (সামনে থেকে প্রায় কোনও বড়সড় লড়াইয়ে অংশ না নিয়েও!) অত্তবড় মহাভারতের অত-অত চরিত্রের মধ্যেও জ্বলজ্বল করতে পারি? তা বাদেও আমার আরও একটা দিকের কথা গোড়াতেই না বলে নিলেই নয়। তা হল গিয়ে প্রেম বিলোনো। প্রেম ‘করা’ নয়, সত্যিই ‘বিলোনো’। অ্যাদ্দিন পর ভাবলে সত্যি…. মিথ্যে বলব না, একটু লজ্জা-লজ্জাই লাগে, কিন্তু তখন মনুষ্যদেহধারণের ভীমরতির ফলস্বরূপই হোক, আর যে কারণেই হোক, সময়ে-সময়ে নিজেই এমন-এমন সব কথা বলে ফেলেছি, শুনলে মনে হবে প্রেম নিয়ে যেন সত্যিই charity করেছিলাম। তবে যাই করে থাকি, ভাল-মন্দ ঠিক-ভুল যা খুশিই করি না কেন, তোদের ওই কৃষ্ণদ্বৈপায়নের পক্ষপাতে চরিত্র আমার এতই বর্ণময়, এতটাই charismatic ছিল, যে সেই কোন দ্বাপর যুগের মানুষ হয়েও আজও আমি (জিৎ গাঙ্গুলি ‘ভজ গৌরাঙ্গ’ গান বাঁধলে আজও নাকি আমার ভক্তরা রে-রে করে ওঠে!) দেশে-বিদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরমশ্রদ্ধেয়, পূজ্যপাদ এবং নিঃসন্দেহে তোদের এই মূঢ়মতি বালখিল্য লেখকেরও প্রিয়তম পৌরাণিক চরিত্র। অ্যাত্তবড় গৌরচন্দ্রিকার পর এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতেই পেরেছিস এই ‘আমি’-টি কে? ওরে হায় বাঙালি হায়, আমিই সেই নররূপী নারায়ণ রে, আমিই পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ।

lk-sudarshan-chakra-junior-24

অতঃপর এ ব্যাটার মাথাটা পড়ে (তোরা যার অল্প কিছুটা করতে পেরেই ‘সিটি স্ক্যান করেছি’, ‘সিটি স্ক্যান করেছি বলে লাফাস!’ ছোঃ!) কী পেলাম, সে কথায় আসি। নিজেই নিজের ঢাক একসময় অল্পবিস্তর পিটিয়েছিলাম বটে, কিন্তু অ্যাদ্দিন পর সত্যিই আর সে প্রবৃত্তি হয় না, বিশ্বাস কর। তাই নিজের কথা নিজে না বলে কেন আমি এই মডার্ন শিশুপালটার (মানে লেখাটা যে অকালকুষ্মাণ্ডটা লিখছিল আর কী!) প্রিয়তম, কেন নাকি ওর আমাকে ‘কখনও-কখনও ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দিতে ইচ্ছে করলেও পরক্ষণেই’ আমার ‘বুদ্ধিবত্তার বিশালত্বের কথা মনে পড়ে শ্রদ্ধায় মাথা ঝুঁকে আসে,’ কেন আমাকে ‘অসহ্য রকমের ভাল-খারাপ দুই-ই লাগে,’ (কোটেড অংশগুলো ওই ম্লেচ্ছটার লেখা!) , কেন যে…. সেসব আলোচনায় ঢোকার আগে গোড়াতেই আরও একটা কথা বলে নেওয়ার দরকার মনে হচ্ছে। মহাভারত সম্পর্কে একটা কথা নিশ্চয়ই তোরা সবাই মানবি যে এটা এমন একখানা মহাকাব্য, যার অসংখ্য চরিত্রের কারও না-কারওর সঙ্গে তোরা আজও নিজেদের মিল খুঁজে পাস? অতিমানবীয় ব্যাপারগুলো নাক-কান বুজে এড়িয়ে গেলে বাকি যে বিপুল গল্পগাথা পড়ে থাকে, তা খুব-খুব বাস্তবঘেঁষা নয় কি? ঘটনাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে চলতে-চলতে বিভিন্ন বাঁকে চরিত্রগুলো যা ভাবে, যা করে, তোরা ওই সময়টায় ওই জায়গায় থাকলে হয়তো তাই-ই করতিস! এখানেই তোদের ওই ব্যাসদেবের সাফল্য। নাঃ, ও পাগলা বুড়োকে মহাকবির খেতাব দিয়ে খুব ভুল তোরা কিছু করিসনি।

দেবকী আর বসুদেবের অষ্টম সন্তান হয়ে এসেছিলাম তোদের এই পাপের দুনিয়ায়। লোকে মানত আমি নাকি ভগবান বিষ্ণুর অবতার। তবে একা আমি এ ধরাধামে আসার সাহস দেখাইনি। বউ লক্ষ্মীকে তো এনেছিলামই (কেউ বলে রাধার রূপে, কেউ আবার বলে আমার ষোল হাজার একশো আট বউ-এর দুই বউ রুক্মিণী আর সত্যভামার মধ্যে ভাগ করে!), মায় শেষনাগ (যে  মহানাগের কুণ্ডলীর ওপর লক্ষ্মীকে নিয়ে বসে থাকি রে বৈকুণ্ঠে!)-কেও এনেছিলাম বড়দাদা বলরামের রূপে। মানে ফুল ফ্যামিলি ট্রিপ যারে কয়! পুরাণ আর মহাভারতের বয়ান অনুযায়ী সেই দ্বাপর যুগে তোদের এই ভারতভূমির মানুষজন বিলাসব্যসনের চরম সীমায় পৌঁছে যথেচ্ছাচার আর অপরিমিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। প্রকৃতি, পরিবেশ আর সর্বোপরি আমাদের, মানে দেবতাদের অমান্য করে ভোগবিলাসে ব্যস্ত সে’যুগের মানুষজন আকণ্ঠ ডুবে ছিল পাপের ঘড়ায়। সে দুর্দশার অবসান ঘটিয়ে ভারতভূমিতে পুণ্য আর সত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই মানুষের রূপ নিয়ে এসেছিলাম। আচ্ছা, একটা কথা কি তোরা কখনও লক্ষ করেছিস? যুগে-যুগে দেবতারা মর্ত্যলোকে এয়েছেন। আর সবসময়ই তেনারা দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করেছেন। ভাল কথা। তবে আমি কিন্তু মোটেই তা করিনি। আমার কাছে সবকটাই দুষ্টু ছিল, সব এক সে বড় কর এক! আর সেজন্যই কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও পেছন থেকে উস্কে, রাজনীতি আর কূটনীতির অসম্ভব সব প্যাঁচ-পয়জার কষে so-called-শিষ্ট পাণ্ডব, দুষ্ট কৌরব তো বটেই, সঙ্গে নিজের আপন যদুবংশটাকেও ঝাড়েবংশে সাফ করে দিয়ে গেছিলাম। সব শালা corrupt! প্রাণে বেঁচেছিল কেবল বয়োবৃদ্ধ, নারী (যাদের অধিকাংশই বিধবা) আর শিশুরা। কী পেয়েছিলাম এমনটা করে? কোনও মানুষে পারে জেনেবুঝে এমনটা করতে? উত্তর পাওয়ার জন্য বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, সাম্প্রতিক ইতিহাস ঘাঁটলেই ভুরি-ভুরি এমন অনেক উদাহরণ পাবি, যেখানে মনুষ্যত্বের চরম অবক্ষয় ঘটেছে মানুষেরই হাতেই। আমি, নরোত্তম শ্রীকৃষ্ণ কি তবে তেমনটাই ছিলাম? নেহাতই এক হত্যাপ্রিয় ঘাতক?

sri-krishna-3d-wallpaper-1920x1080

নাঃ! অহেতুক কিছুই করিনি। কী করছি, কেন করছি, সে বিষয়ে আমৃত্যু নিজের মন আর মাথার কাছে পরিষ্কার ছিলাম। তোরা তো আবার অবিশ্বাসী জেনারেশন! সবকিছুতেই একটা করে ‘কেনওওও?’ লাগাতে পারলে বাঁচিস। তা বেশ, দেবত্ব অস্বীকার করে আমাকে যদি সাধারণ মানুষও ধরে নিস, তবে কী ছিলাম আমি? আদতে একজন ধুরন্ধর কূটনীতিক ছিলাম। তবে কী, বিষ্ণুপুরাণ অনুযায়ী আমি নাকি বেশ অল্পবয়সেই কালীয়নাগকে মেরে ফেলেছিলাম, পুতনা রাক্ষসীরও একই হাল হয়েছিল, তারপর পরাক্রমী মামা কংসকে হত্যা করে দাদু উগ্রসেনকে সিংহাসনে বসালাম, একবার তো দেবরাজ ইন্দ্রকেও হারিয়ে দিয়েছিলাম (সেসব ঘটনার সত্যাসত্য নিয়ে তোরা কামড়াকামড়ি করে মর গে যা!)। অত অল্প বয়সেই অ্যাত-অ্যাত অতিমানবীয় কীর্তি পকেটে পুরেছেন যিনি, তাঁকে তো আম আদমি দেবতা ঠাউরাবেই। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর আমিও আম আদমির এই বিশ্বাসে কোনওদিন আঘাত দিইনি। দেব কেন রে? বরং আমি এবম্বিধ উপমা চেটেপুটে উপভোগ করতাম। তোরা যেন করিস না মনে হচ্ছে? বুকে হাত রেখে বল দেখি, তোদের ওই ফেসবুকের আপডেটে লাইক পড়লে ঘটোৎকচ বধের পর আমি যেমন উদ্বাহু হয়ে নেচেছিলাম, তোদের মনটাও কি সেভাবেই নেচে ওঠে না? যত্তসব!

যাইহোক, দেবতা ছিলাম, না ছিলাম না, দৈব ইচ্ছানুযায়ী মহাভারতের ঘটনাপ্রবাহকে আমিই চালিত এবং নিয়ন্ত্রিত করেছিলাম না করিনি, সে তর্কের অবসান ঘটানো আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং তোদের ওইসব তর্কের মধ্যে দিয়েই আরও কয়েক যুগ তোদের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই আমি। কিন্তু ওই নিয়ন্ত্রণটুকু সত্যিই করেছিলাম। আর কিছু থাক বা না-থাক, অতিমানবীয় বুদ্ধি আর দূরদর্শিতাটুকু তো ছিলই, বল? আলবাত ছিল।

মহাভারতের যুদ্ধ আর তাতে আমার ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি নিয়ে কথাও আপাতত মুলতুবি থাক। বরং আমার চরিত্রের মূলত যে দিকটা আমাকে হিন্দুসমাজে অ্যাতোকাল ধরে অ্যাতো জনপ্রিয় করে রেখেছে, আমার সেই প্রেমিক সত্তা নিয়ে কথা হোক। #হোককলরব ছেড়ে #হোকপ্রেমনিয়েকথা! তা প্রেমের কথা বলতে হলে তখন বাপু সময়টাই এমন ছিল যে…. আমিও সেজন্যই…. মানে, ওই যুগের ধর্ম মেনেই আর কী, শৈশব থেকে কৈশোরে পা দিতে না-দিতেই শুরু করেছিলাম ‘লীলাখেলা।’ গোপিনীদের সঙ্গে অহরহ প্রেম-পিরিত তো ছিলই, সঙ্গে ছোট্টবেলা থেকেই কায়মন সঁপে দিয়ে ওই রাধা মেয়েটাও ছিল। যদিও ওর সঙ্গে প্রেমটা শেষমেশ টেকেনি। কোথাকার কে আয়ান ঘোষ (সে নাকি আবার আমারই মামা ছিল! বোঝো!)-কে বিয়ে-টিয়ে করেছিল। বিয়ের পরেও অবিশ্যি শুনেছি সে মেয়ে নাকি আমাকেই চেয়ে গিয়েছিল সারাজীবন। সে যাক গে যাক, তারপর একে-একে আমারও ষোলোহাজার একশো আট বউ হয়েছিল। নরকাসুরকে মেরে ওর খপ্পর থেকে ষোলোহাজার একশো মেয়েকে বাঁচানোর পর ওদের গতি করতে সক্কলকে আমাকেই বিয়ে করতে হল। ওরাও নাকি আমাকেই চেয়ে গেছে জন্মজন্মান্তর। আদেখলাপনা আর কাকে বলে! তবে রুক্মিণী আর সত্যভামাকেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভালবাসতাম। ওঁদের মতো আপন করে আর কেউ আমাকে বোঝেওনি কোনওদিন। আর একজনকেও চেপেচুপে লুকিয়ে-চুরিয়ে বেশ admire করতাম, ব্যাপারটা অনেকদিন অবধি কাকপক্ষীতে টেরও পায়নি, কিন্তু তোরা থাকতে সে উপায় আছে? তোদের ওই সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্র তো যাচ্ছেতাইভাবে দিয়েছে সব ফাঁস করে, ওর ওই ‘পাঞ্চজন্য’ বইতে। তাতে অবশ্য কিস্যু এসে যায় না আমার। গান্ধারীর অভিশাপেও অবিচল ছিলাম রে, আর এ তো সামান্য এক দেহধারীর লেখা। আসলে মনুষ্যদেহ নিয়ে এসেছিলাম তো, দেবতা হয়েও তাই মানবিক দুর্বলতাগুলো সময়ে-অসময়ে একটু হলেও চেপে বসেছিল আমার উপরেও। হয়তো সেজন্যই পাঁচ পাণ্ডবের বউ ওই কৃষ্ণাকে বেশ লেগেছিল। প্রথম প্রেমে পড়লে যে একান্ত গোপন symptom গুলো দেখা যায়, ওগুলোই হত আমারও ওঁকে দেখলেই। কিন্তু সেসবই ছিল আমার মনের অতল গভীরে। বাইরে কাউকে কিন্তু কোনওদিন কিচ্ছুটি বুঝতে দিইনি। রাজনৈতিক যে উদ্দেশ্য সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরত আমার, সৌভাগ্যক্রমে কৃষ্ণার চিন্তা সেগুলোকে দমাতে পারেনি। তবে গজেন্দ্র যে লিখেছে, কর্ণ মারা যাওয়ার পর যখন জানাজানি হল যে ও-ও আদতে এক পাণ্ডব, যুধিষ্ঠিরের অগ্রজ, তখন যে দ্রৌপদীর কান্না দেখে আমার হিংসে হয়েছিল, সেকথা সত্যি। অ্যাদ্দিন পর আর স্বীকার করতে দোষ নেই, হয়েছিল হিংসে! তবে কিনা, সেটা আমার দোষ বলে আমি মানি না, বরং দোষ তোদের মনুষ্যস্বভাবের! শালা, মানুষের জাত!

bhishma-pitamah-shri-krishna-mahabharata

এবার আসি যুদ্ধের কথায়। আঠেরো দিন ধরে চলা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যখন অবশেষে শেষ হল, তখনও বোকা পাণ্ডবগুলো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি কোথা থেকে কী হয়ে গেল। যুদ্ধের কতটা ওরা জেনেবুঝে করল, আর কতটাই বা আমার ইচ্ছেয়, বোঝেনি কিচ্ছুই। কিন্তু সবার সামনে এসে হাটে হাঁড়িটা ভাঙলেন গান্ধারী। রেগেমেগে সবকিছুর জন্য আমাকেই দায়ী করে দিলেন একখানা অভিশাপ ঠুকে। নাঃ, ভুল কিছু বলেননি অবিশ্যি। আমি নিজেও তো সারাজীবন সেটাই মেনে এসেছি। বিশেষ কিছু সময়ে সব্বার সামনে ঠারে-ঠুরে স্বীকারও করেছি সে কথা। নিয়তিই বল, আর অদৃষ্টই বল, তারই ফেরে আমাকে করতে হয়েছিল ওসব। যুদ্ধশেষে যখন কোটি-কোটি যোদ্ধা ঘাম, রক্ত, ধুলো আর কাদা মেখে প্রাণ হারিয়ে গলে-পচে শুয়ে আছে যুদ্ধক্ষেত্রে, মাথার ওপর উড়ছে শকুন, কাকের দল, দেহগুলো নিয়ে টানাটানি করছে শেয়াল-কুকুররা, বিধবাদের কান্নায় ভরে উঠেছে চরাচর, তখনও কিন্তু আমার একটুও খারাপ লাগেনি। লাগবে কেন? সেই কোন ছোট্টবেলাতেই তো মামা কংসকে মেরে জ্ঞাতিবধে হাতেখড়ি করেছিলাম আমি। আজ পাণ্ডবদের আত্মীয়নাশে সেই আমার খারাপ লাগলে চলে, বল তোরা? এমনটা যে হবে, ঠিক এমনটাই, তা তো আমি জানতামই। সমস্তটাই তো আমার মস্তিস্কপ্রসূত! গল্পের আগাপাশতলা সবটাই তো জানতাম আমি। চাইলেই বন্ধ করে দিতে পারতাম ওই লোকক্ষয়কারী যুদ্ধ। অনেক, অনেক সর্বনাশকে জন্মলগ্নেই টুঁটি চিপে মারতেই পারতাম। কিন্তু তা করিনি বলে আমাকে দোষারোপ করাটা কি খুব সমীচীন? আরে আমি তো ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম! পরশুরাম করেননি পৃথিবীকে একুশবার ক্ষত্রিয়শূন্য? আমিও সেরকমই একটা চেষ্টা করেছিলাম। তফাত শুধু এই ছিল যে আমি নিজেই কুঠার হাতে নেমে পড়িনি। দেহের বদলে মাথার শক্তির ওপর ভরসা রেখেছিলাম। যদিও এত করেও শেষমেশ খুব একটা কিছু যে লাভ হয়নি, আজ সেটা বিলক্ষণ উপলব্ধি করি।

মহাভারতে কী-কী কূট চাল আমি নিয়েছিলাম, সে নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ আছে কি? জানিস তো অল্পবিস্তর সবটাই তোরা সকলেই। ঘটোৎকচকে ইচ্ছে করে কর্ণের অস্ত্রে মরতে পাঠিয়েছিলাম, ভীষ্মবধের কৌশল ভীষ্মকে দিয়েই বলিয়ে নিয়েছিলাম আমিই, আবার নিরস্ত্র কর্ণকে মারতে গিয়ে অর্জুন যখন ইতস্তত করছে, ওকে উস্কে কর্ণবধ করিয়েছিলামও এই আমিই। আমিই সূর্য অস্ত যাওয়ার মিথ্যে রোল তুলে জয়দ্রথকে অন্যমনস্ক করেছিলাম। যুদ্ধের শেষভাগে গদাযুদ্ধের সময় দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করার জন্য ভীমকে উস্কেছিল কে? তোদের এই নররূপী নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণই তো। অর্জুনটাকে অবশ্য বেশ লাগত বরাবর। skill ছিল বটে ছেলেটার। গুরু বলে মানত আমাকে। কিন্তু বাইরে যতটাই পরাক্রমী, ভিতরে-ভিতরে ততটাই ক্যাবলা ছিল। দ্রৌপদীর জন্য হ্যাংলামোর কথা তো ছেড়েই দিলাম, ভারতভ্রমণে যখন বেরল; মানছি আমিই বলেছিলাম ওকে গোটা চার-পাঁচ বিয়ে করে ফিরতে; ফিরে আসার পর দেখি, ওমা! ছেলে সত্যিই তাই-ই করে ফিরেছে!

সে যাকগে, সবথেকে বড় দোষটা আমাকে বোধহয় এইজন্য দেওয়া হয় যে সর্বজ্ঞ হয়েও আমি কাউকে আটকাইনি, বরং প্রত্যেককে যেন হাত ধরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম। তা একটা কথা আমাকে বল তো, ভগবান তো জানেন সবই। আজ তোর পাশের বাড়ির সরল-সাদাসিধে ভালমানুষ মন্টুকাকু যখন হঠাৎ বাস অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান, তখনও তো ভগবানের সেটা আগে থেকেই জানা থাকে। তবু যে উনি সেটা আটকাননি, তার জন্য রাগ করে কি ভগবানের মুখদর্শন বন্ধ করে দিস? নিয়তিকে খণ্ডাবে কে, বল তো শুনি? আমিও তো সেই নিয়তিরই নির্দেশ অনুসরণ করেছিলাম মাত্র! তার জন্য খামোখা আমাকে কাঠগড়ায় চাপাস কেন?

lord-krishna-defeting-karna-in-mahabharata

জানি, তোরা আজকালকার ছেলেমেয়েরা এইসব নিয়তি, ভাগ্য, জন্মান্তরে বিশ্বাস করিস না। তোদের কাছে এসবই “বুলশিট!” জন্ম একটাই, তাতে মানুষের কৃতকর্মের দায়ও তার নিজের একার, এই তোদের বিশ্বাস। আমার কথায় তাই তোদের পেত্যয় হবে না। তা বেশ, করিস নে বিশ্বাস, মানিস নে। জন্ম দিয়েছে যে বাপ-মা, তাঁদের কথাই তোরা আজকাল মানিস না, শিক্ষা দিয়ে শিখিয়ে-পড়িয়ে বড় করছে যে শিক্ষকরা, নিজের হাতে তাদেরকে কিল-চড়-অবরোধ সহযোগে শিক্ষা দিস তোরা! ঘোর এই কলিকালে আমি তো কোন ছার! তবে তা বলে আমার ভক্তরাও যে হারিয়ে গিয়েছে এমনটা নয়। তারা আজও আমাকে মাথায় করে রাখে। অন্তত তাদের মুখ চেয়ে আরও কয়েকটা কথা বলে যাব। ঈশ্বরত্ব আছে বলেই কারওর কাছে জবাবদিহির আমার দায় নেই। কিন্তু একটা সুযোগ যখন পেয়েছি, কতগুলো কথা বলে যাওয়ার এই প্ল্যাটফর্মটা এক্ষুনি ছাড়তে মোটেই ইচ্ছে করছে না। তবে ভয় পাস না। আবার একখানা গীতা বলে বসব না! হা! হা! হা! ওটা নেহাতই নিজের উদ্দেশ্যসাধনহেতু অর্জুনের মাথাটা চেবানোর জন্য বলেছিলাম। তোরা কেউ কেউ আজও  মন দিয়ে সেগুলো পড়িস দেখে হাসিও পায়, ভালও লাগে! লিখলেন আসলে ব্যাসদেব, নাম হল গিয়ে আমার! হা! হা! হা!

অনুশোচনা। হ্যাঁ, অনুশোচনা আমার হয়েছিল শেষমেশ। না হলেই আশ্চর্য ছিল। মহাভারতের যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকে একেবারে শেষ অবধি খুব বিশ্বাস রেখেছিলাম নিজের বুদ্ধিবত্তার ওপর। এই একখানা সত্যিকারের গুণ ছিল আমার, সে তোরা যাই-ই বল। অসম্ভব রকমের আত্মবিশ্বাস ছিল। অমানুষিক আত্মবিশ্বাস। যাক গে যাক… শেষটুকুতে এ ছেলে নিজেই যা লিখেছিল, সেটুকুই থাক। পুরনো সব কথা তুলতে-তুলতে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে। কলম আর সরছে না…

‘শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রের যে দিকটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, তা হল তাঁর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস। এই একখানা গুণের অভাবে অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষও হারিয়ে যান। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে আত্মবিশ্বাসটা ছিল সত্যিই দেখার মতো। বুদ্ধি তো অপরিসীম রকমের ছিলই, কিন্তু মহাভারতের মতো মহাযজ্ঞের নেপথ্য নিয়ন্ত্রক হতে হলে আরও বেশি কিছু দরকার, যা ব্যাসদেব উজাড় করে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে। অসম্ভব রকমের সুচিন্তিত পরিকল্পনা করে এগোতেন প্রতিনিয়ত। রহস্যময়তায় মোড়া শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র থেকে নিশ্চয়ই অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। আমি আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় ওইটুকুখানি শেখার চেষ্টা করেছি, করে চলেছি প্রতিনিয়ত। চোখ বুজে নিস্তব্ধ রাতে মহাভারতের কথা ভাবলে আমার কল্পনায় ভেসে ওঠে রক্তাক্ত এক যুদ্ধক্ষেত্র, তাতে পড়ে রয়েছে স্তূপীকৃত মৃতদেহ, পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর জল রক্তবর্ণ, মাথার উপরেও দিগন্তবিস্তৃত লাল আকাশ। আর সেই মৃত্যুর পরিবেশে, চতুর্দিকে মৃত্যুর সেই উল্লাসের মাঝেও অচঞ্চলভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শঙ্খ, চক্র, গদা আর পদ্মে শোভিত নীলাভ চতুর্ভুজ। চোখে যার এতটুকুও শোক নেই, অনুতাপ নেই। নিজের কাজটুকু সম্যকভাবে করতে পেরেই তৃপ্ত সেই কর্মযোগী মহাপুরুষ। নিজের সমস্ত জীবনে যিনি প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গিয়েছেন গীতার সেই অমোঘ শ্লোকের সত্যতা,

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন ।

মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি ।।”

(“কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মের ফলে কদাচ নয় । কর্মের ফল কামনা কোরো না, নিষ্কর্মাও হয়ো না ।”)

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s