সেই প্রেম, যে… (১৬ জানুয়ারি, ২০১৭)

%db%b3-%d9%87-%d8%b4-1-2

“এইটা হল কুইন অফ পিস চার্চ, চিনে রাখ। আর এই হল গিয়ে আজাদ হিন্দ ধাবা।”
“আচ্ছা! এইখানেই তা হলে সেই বিখ্যাত আজাদ হিন্দ!”
“হ্যাঁ, আর এই জায়গাটা দেখে রাখ। এটাকে বলে গাছতলা। কোনও এককালে বড় কোনও বট কিম্বা অশ্বত্থ গাছ থেকে থাকবে হয়তো এখানে।”
“হুম।”
“আর এটা হল নেতাজিনগরের নেতাজি স্ট্যাচু। আর একটু এগোলেই আমিনিয়া রেস্টুরেন্ট।”
“আরেব্বাহ! এত কাছে একটা আমিনিয়াও আছে? দারুণ তো!”
“হ্যাঁ, সেটাই তো বলছি। এই রাস্তাটা অনেকটা লম্বা। অনেক কিছু আছে আশপাশে। আমিনিয়াটা জাস্ট পেরলেই হাতের বাঁদিকে পড়ে মালঞ্চ সিনেমা হল। যাইহোক, আমি এবার নামব, বুঝলি? বাকি রাস্তাটা সাবধানে যাস। আর টালিগঞ্জে খুব দেখেশুনে তবে রাস্তা পেরস। আর বাড়ি ঢুকে মেসেজ করে দিস একটা, কেমন? চল, আসি, ওকে? বাই! এই যে দাদা, একটু দেখি, আমি নেমে যাব এইখানটায়।”
“হুম, বাই। সাবধানে যাস!”

ওই যে শেষে এসে কোনও এক দাদাকে একটু নেমে দাঁড়াতে বলা হল, ওইটা আমি। অটোয় চেপে এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। পথেঘাটে বেরলেই কানে হেডফোন গুঁজে রাখাটা আমার চিরকালের বদভ্যেস। আজ ভাগ্যিস সেসময় কানে হেডফোনটা দেওয়া ছিল না। থাকলে কি আর এত মিষ্টি একটা কথোপকথনের সাক্ষী থাকতে পারতাম?

মিষ্টি নয়? একজন অন্যজনের পাড়ায় নতুন। হয়তো বা জীবনেও। ছেলেটির পরিচিত রাস্তা তাই মেয়েটির কাছে এখনও অচেনা। যে রেস্তরাঁ কিংবা সিনেমাহল ছেলেটির হয়তো বা আবাল্য চেনা, মেয়েটি আজ প্রথমবারের জন্য দেখছে সেসব। শুধু দেখছেই না, দেখে, শুনে, চিনে রাখার আপ্রাণ চেষ্টাও করছে। কে বলতে পারে, মার্কশিটের একচোখোমি অনুযায়ী ওই ছেলেটা হয়তো মেয়েটার চেয়ে লেখাপড়ায় খারাপ। ওরা সমবয়সী হলে ম্যাচিয়োরিটিতেও নিঘঘাত ছেলেটিই পিছিয়ে থাকবে মেয়েটির চেয়ে। হয়তো সে ছেলে এই জগতের আর কিচ্ছুটিই চেনে না, জানে না কোনও মারপ্যাঁচ, কোনওই কাটাকুটি খেলা।

আজকের ওই মুহূর্তগুলোর জন্য সে শুধু ওই রাস্তাটুকু আর তার দু’পাশের রেস্তরাঁ, চার্চগুলো চিনে রেখেছে। চাইছে তার বান্ধবীকেও চেনাতে। যাতে ভবিষ্যতে তার সাহায্য ছাড়াই মেয়েটি একা-একা পা রাখতে পারে এই এলাকায়। নিজেও জায়গাটা ঠিকঠাক চিনে না নেওয়া অবধি মেয়েটির কানে যেন বাজতে থাকে ছেলেটির কণ্ঠস্বর, “আর এই জায়গায় আছে একটা নেতাজির স্ট্যাচু, আর এই হল গিয়ে–” ব্যস! এটুকুই। ঠিক এটুকুই যেন সাধ সেই ছেলের।

 
শহর কিংবা শহরতলি কিংবা অখ্যাত কোনও গ্রামেও, ঠিক এইরকম কোনও কোনও রাস্তার শুরু আর শেষেই কেমনভাবে যেন এক হয়ে যায় পৃথিবীর সমস্ত প্রেমের গল্প। তাই না? কে জানে আজকে আমার দেখা ওই ছেলেমেয়েদুটো কতদিন একসঙ্গে থাকবে, কিন্তু যতদিন থাকবে, এবং তারপরও বহুদিন ওই রাস্তাটা কিন্তু থাকবে ওখানেই। ওই রাস্তার আশপাশের জায়গাগুলোরও অনেক ক’টাই একইরকমভাবে কিংবা আমূল পালটে গিয়ে থেকে যাবে ওখানে। আর থেকে যাবে প্রেম।

favim-com-beautiful-life-photography-322108

যে প্রেম শুধু দিতে জানে অন্যকে নিজের সবটা। যে প্রেম তোমাকে মাইকেল জ্যাকসন শেখাতে না পারলেও চেষ্টাচরিত্র করে ব্রেক ডান্সটুকু শিখিয়ে দিয়ে যাবে ঠিক। যে প্রেম টিকুক ছাই না টিকুক, যাওয়ার আগে, শেষদিন পর্যন্ত ঋদ্ধ করে যাবে তোমাকে। এ হল সেই প্রেম, যে তোমাকে টাইগার হিলে না নিয়ে যেতে পারলে রবীন্দ্র সরোবরে নিয়ে গিয়েই দেখিয়ে দেবে সূর্যোদয়। যে প্রেম নিজের কুয়োর বাইরে আর কিচ্ছুটি না চিনতেই পারে, কিন্তু তুমি একবার বললে কুয়োর প্রত্যেকটা ইটে সে যত্ন করে লিখে রাখবে তোমার নাম…

 
ভগবান করুন, আজকের ওই ছেলেমেয়েদুটো এভাবেই সারা জীবন, একের অজানা সবটা, অন্যজনকে শেখাতে থাকুক। 🙂

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s