জাল্লিকাট্টু (২০ জানুয়ারি, ২০১৭)

madurai-alanganallur-jallikattu

জাল্লিকাট্টু। তামিলদের অতিপ্রাচীন এক অনুষ্ঠান। তাতে ষাঁড়কে ইনভলভ করে কিছু একটা হয়। যেখানে নাকি ষাঁড়ের উপর হেবি অত্যাচার হয়। তাদের নেশা করিয়ে ল্যাজ পেঁচিয়ে দৌড় করানো হয় ইত্যাদি। অগত্যা পেটা-র (People for the Ethical Treatment of Animals) নালিশ। সমস্ত দিক বিবেচনা করে দেশের শীর্ষ আদালত হুকুম দিলেন, মহারাষ্ট্রের ষাঁড়ের লড়াই, তামিলদের ষাঁড়ের দৌড়, সারাদেশের এরকমই আরও কয়েকটা সমগোত্রীয় খেলা, যেখানে পশুদের উপর একটুও অত্যাচার হয় বলে খবর, সবই অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

সেই অনুযায়ীই এবছর জাল্লিকাট্টু বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তামিলরা বেঁকে বসেছেন। সে বেঁকা এমন বেঁকা যে তাঁদের যুবকেরা (আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রাচীনপন্থী বুড়োরা নন মোটেই!) বেঁকে একেবারে টেড়ামেড়া কুড়কুড়ের আকার নিয়েছেন এক-একজন! সকলে মিলে তাঁরা দল বেধে পথে নেমেছেন। শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। মিছিল করছেন। সই সংগ্রহ করছেন। অধুনা যে কোনও যুববিপ্লবের আঁতুড়ঘর ফেসবুকে, টুইটারে তামিল যুবারা প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। দাবি একটাই, ‘আমাদের অতিপ্রাচীন ঐতিহ্যের পরিচায়ক এই খেলা বন্ধ করা যাবে না।’

এবং কীমাশ্চর্যম! জাল্লিকাট্টুর উপর শীর্ষ আদালতের এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে তামিল যুবকদের এই আন্দোলন, এই প্রতিবাদে সায় দিয়েছেন কমল হাসান, রজনীকান্ত, এ আর রহমানের মতো তাবড় তাবড় শিল্পীরা! রহমান তো আজ সারাদিন অনশন করেই কাটিয়ে দিলেন! বাকিরাও নিজের নিজের মতো করে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার টুইটাশ্বাস দিয়েছেন।

রজনীকান্ত যেমন। বলেছেন, এই ঐতিহ্যকে এভাবে জোর করে বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। চাইলে সরকার ব্যবস্থা করুক, খেলা চলাকালীন যাতে ষাঁড়ের উপর অত্যাচার না হয়, তা কড়া নজরে রাখার! কিন্তু তা না করে একেবারে খেলাটাই বন্ধ করে দেওয়া ভারী ইয়ান্না রাস্কেলা সিদ্ধান্ত হবে ইত্যাদি… মোটামুটি একই বক্তব্য অন্যান্য দক্ষিণী তারকা, মহাতারকাদের।

এত কথা যাকে নিয়ে, সেই জাল্লিকাট্টু খেলাটা ঠিক কী?

jallikattu_protest_2

ষাঁড়ের লড়াই? উঁহু। ষাঁড়ের দৌড়? উঁহু মশাই উঁহু। তবে? খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, এই খেলায় একটি স্টার্টিং পয়েন্ট থাকে, থাকে একটি ফিনিশিং পয়েন্ট। শুরুর দাগে একটি সুপুরুষ, বলিষ্ঠ ষাঁড়কে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব প্রবল পরাক্রমে ফিনিশিং লাইন অবধি পৌঁছনো। খেলার নিয়ম অনুযায়ী শুরু আর শেষের মাঝে এক-এক করে দু’পেয়ে মানুষরা দৌড়তে ব্যস্ত ষাঁড়ের পিঠের কুঁজ ধরে তাকে থামানোর চেষ্টা করবে। নিয়ম অনুযায়ী ষাঁড়ের দেহের অন্য কোনও অংশ ধরেই তাকে থামানোর চেষ্টা করা যাবে না। এবার তুমি ষাঁড়কে থামানোর চেষ্টা করবে আর ষাঁড় চেষ্টা করবে তোমাকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলার। এই করতে করতে যদি তুমি ষাঁড়বাবাজিকে ফিনিশ লাইনের আগেই থামিয়ে ফেলতে পার, তবে তুমি জয়ী। আর যদি সে ব্যাটা সমস্ত দু’পেয়েকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে একা একাই ফিনিশ লাইনে পৌঁছে যায়, তা হলে জয়টীকা পরানো হবে তার কপালে। ষাঁড়ের পুরস্কার? তাকে নিয়ে গিয়ে তখন ছেড়ে দেওয়া হবে একপাল সুদর্শনা, সুলক্ষণা গোরুদের মাঝে। তাদের সঙ্গে মিলন শেষে ষাঁড়ের যে বাচ্চাকাচ্চা হবে, আশা করা যায়, তারাও তাদের বাপের মতোই বলশালী বাহুবলী হইবেক। অতঃপর তাদের দিয়ে নিশ্চিন্তে লাঙল টানিয়ে মস্ত মস্ত জমি এক নিমেষে চষিয়ে ফ্যালো। এই হল অতি সংক্ষেপে গল্প।

 

মুশকিল এই যে, এই করতে গিয়ে আপত্তিকর যা-যা করা হয়, সেগুলো এই প্রকার—

১) ষাঁড় তো আর স্টার্টিং লাইন আর ফিনিশিং লাইনের হিসেব বোঝে না। তাকে দৌড় করাতে অতএব বেচারাকে অনেকসময়ই শুরুতে জোর করে বেশ ক’পেগ মদ গেলানো হয়।

২) তারপরেও সে ফিনিশিং লাইনের তাৎপর্য বুঝতে না পারলে দাও ব্যাটার ল্যাজ মুচড়ে! দৌড়বি না মানে?

৩) নিয়ম ভেঙে প্রায়শই ষাঁড়ের পিঠে চেপে পড়ে একাধিক দু’পেয়ে। এবং হিট অফ দ্য মোমেন্টে তাদের অধিকাংশই ষাঁড়ের কুঁজ ধরতে না পেরে ষাঁড়ের গলা ধরে ঝুলে পড়ে। কেউ বা চেপে বসে পিঠে।

৪) ষাঁড় তো ব্যাটা ক-অক্ষর বউ-মাংস। অতএব সে নেশার ঘোরে দ্যাখে, দৌড়নোর সময় তার চারপাশে হাজারে-হাজারে দু’পেয়ের ভিড়। তার মাঝেই বেশ ক’জন দাঁত-মুখ খিচিয়ে ধেয়ে আসছে তার দিকে। কেন রে ভাই! মারবে নাকি? চকিতে ষাঁড়ের হার্টবিট বেড়ে কয়েক হাজার লাব-ডাব! বাঁচতে হলে দৌড়-দৌড়-দৌড়! ভাগ ষাঁড় রে ভাগ!

1024px-%e0%ae%8f%e0%ae%b1%e0%af%81%e0%ae%a4%e0%ae%b4%e0%af%81%e0%ae%b5%e0%af%81%e0%ae%ae%e0%af%8d_%e0%ae%b5%e0%ae%bf%e0%ae%b4%e0%ae%be

অতএব পেটার আপত্তি। অতএব শীর্ষ আদালতের নির্দেশে এই খেলায় স্থগিতাদেশ। অতএব তামিল যুব সম্প্রদায়ের আন্দোলন। অতএব অস্কারজয়ী রহমানের অনশ… কিন্তু এক মিনিট! রহমান স্যার, রজনী মহাস্যার, এই যে আপনারা বলছেন, দরকার হলে প্রশাসন ব্যবস্থা করুক, ষাঁড়ের উপর যেন কোনও অত্যাচার না হয়, কিন্তু খেলা চলুক— তা মশাই, সেটা কি আদৌ সম্ভব? হাজার লোকের ভিড়ে প্রত্যেক মানুষপিছু একজন করে পুলিশের ব্যবস্থা করলেও কি সম্ভব, প্রত্যেক ইন্ডিভিজুয়াল মানুষের প্রত্যেক মুভমেন্টকে কন্ট্রোল করা? ভিড়ের মাঝে কেউ যে ষাঁড়ের লেজ মুচড়ে দেবেই না, হাম্মা হাম্মার জায়গায় হাম্বা হাম্বা সুর বেঁধেও কি রহমান তা এনশিয়োর করতে পারেন? সিরিয়াসলি?!

 

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখাজ্জির কাছে আর্জি জানিয়েছে, জাল্লিকাট্টুর উপর স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হোক। ফাক ষাঁড়। ফাক পশুপ্রেম। ফাক মানবিকতা!

 

ঐতিহ্য বেঁচে থাকুক। সতীদাহ আবার চালু হোক। বিধবাবিবাহ চুলোয় যাক। ফাক রামমোহন! ফাক বিদ্যাসাগর! থু! ইয়ান্না! রাস্কেলা! হাম্মা! হাম্বা!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s