চুপকথাদের রূপকথা (২৯ জানুয়ারি, ২০১৭)

lake

লেকের ধারে বসেছিল দু’জন। আজই দু’জনের শেষ দেখা। অনেক ভেবেচিন্তে তবেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে দু’জনে। এমন একটা সিদ্ধান্ত মোটেই সহজ নয় নেওয়া। বিশেষ করে যখন তার পিছনে পড়ে থাকে পাঁচ-পাঁচটা বছরের হাজারপাঁচেক স্মৃতি।

লেকে এসে পৌঁছনোর পথে টুকটাক একটা-দুটো কথা হলেও এখানটায় এসে পৌঁছনোর পর দু’জনেই চুপ। একটা অসম্ভব গরম দুপুরের পর শহরটাকে খানিক স্বস্তি দেওয়ার আশ্বাস গায়ে মেখে নিঝুম একটা সন্ধে নামব-নামব করছে। অন্ধকারে হাতড়ে মরতে না চেয়ে তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত পাখিদের কিচিরমিচিরে যেন একটা ছোটখাটো ঝড় উঠেছে সমস্ত এলাকা জুড়ে।

দু’জনে পাশাপাশি বসে আছে একটা পাথুরে বেঞ্চির উপর। অন্যদিনের সঙ্গে তফাত শুধু এই যে আজ এর হাতের নিকোটিন মাখা পাঁচ আঙুলের ফাঁকে জড়ানো নেই ওর নরম পাঁচ আঙুল। দু’জনের মাঝখানে ক্রমশ জমাট বাঁধতে থাকা নিস্তব্ধতাটা মেয়েটিই ভাঙল আগে। খুব মৃদু গলায় সামনে লেকের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিছু বলবি না?”

ছেলেটা একবার গলাখাঁকারি দিয়ে উত্তর দিল, “কী শুনতে চাস, বল।”

“তোর নিজে থেকে কিছু বলার নেই?”

“মোদ্দা কথাটা তো হয়েই গিয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপে। তারপরেও শেষ একবার মুখোমুখি তো তুই-ই বসতে চাইলি।”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও খুব মৃদুস্বরে বলল, “তুই… তোর কষ্ট হচ্ছে না একটুও?”

ছেলেটার দিক থেকে একটা বিষণ্ণ হাসির আওয়াজ ভেসে এল। এতক্ষণে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। এদিকটায় কোনও স্ট্রিট ল্যাম্পও নেই। পাশাপাশি বসেও একে অন্যের মুখ দেখতে পাচ্ছে না ওরা কেউ। সদ্য নেমে আসা অন্ধকারে এখনও কারও চোখ সয়ে যায়নি বলেই হয়তো।

ছেলেটা সরাসরি উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করে বসল, “কেন? আমার কেন কষ্ট হবে?”

হঠাৎ গলাটা ধরে এল মেয়েটার। কাঁপা স্বরে সে বলল, “তোর এতদিনের সবচেয়ে কাছের লোকটা তোকে অন্য কারও জন্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তোর একটুও কষ্ট হচ্ছে না?”

খুব ঠান্ডা গলায় উত্তর এল, “নাহ। হচ্ছে না, সত্যিই।”

rabindra-sarovar

 

উত্তরে মেয়েটার দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ এল না দেখে ছেলেটাই বলতে শুরু করল আবার, “কেন কষ্ট হবে বল তো? আমি নিজে কি দুনিয়ার সবচেয়ে খাঁটি পুরুষমানুষ নাকি? আমি পাশে থাকতেও অন্য যাকে খুঁজে পেয়েছিস, তার সঙ্গেই তুই নিশ্চয় আরও ভাল থাকবি। এ তো ভাল ব্যাপার।”

“তুইও তো আমি তোর পাশে থাকা সত্ত্বেও ঋতিকার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলি। পড়িসনি? কেন তখন চলে গেলি না ওর সঙ্গেই?”

“তোর আর আমার গল্পটা তখনই শেষ হয়ে যাবে, এটা মানতে পারিনি যে। তাই পা পিছলালেও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ফিরে এসেছিলাম। তোর হয়তো উচিত ছিল সেইদিন আমাকে ফিরিয়ে না নেওয়া।”

“তুই সেই সুযোগ দিয়েছিলি আমাকে? আমার পা ধরে কান্নাকাটি করে বারণ করিসনি আমাকে, তোকে ছেড়ে না যেতে?”

“হ্যাঁ, করেছিলাম।”

“আজ তবে করছিস না কেন? এত খারাপ আমি?”

“কক্ষনও না। আর of all people আমি তোকে খারাপ বলব কী করে, বল তো! আমি নিজেও তো একই কাজ করেছিলাম। তফাত এই যে আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম, আর তোকে যেটুকু চিনি, তাতে তুই আর কিছুতেই ফিরে আসবি না জানি। কষ্ট পেয়ে তাই লাভ কী?”

“আজকাল কষ্ট পাওয়ার আগেও হিসেব করিস?” মেয়েটা চোখ মুছে হাসল এতক্ষণে একটু।

ছেলেটাও হেসে বলল, “বেহিসেবি আমাকে কবেই বা তোর পছন্দ ছিল বল? এতদিন তবু তুই পাশে ছিলি, তাই তোর পরামর্শে কান না দিয়ে অনেক হিসেবে ফাঁকি দিয়েছি। এবার একা। একটু হিসেবি না হলে তো বিয়ে-থা করতে পারব না রে পাগল।”

মেয়েটাকে চুপ দেখে ছেলেটাই আবার বলল, “আর আমি কষ্ট পাবই বা কেন? ঋতিকার প্রতি আমি অল্প সময়ের জন্য দুর্বল হয়ে পড়লেও ওকে যে ভাল বাসিনি কোনওদিন, সেটা তো তুইও জানিস। ভাল তোকেই বেসেছিলাম, এখনও বাসি। কিন্তু রাতুলকে তো নাকি তুই ভালবেসে ফেলেছিস। তা হলে কী দাঁড়াল বিষয়টা? আমি এমন কাউকে হারাচ্ছি, যে আমাকে আর ভালই বাসে না। আর তুই এমন কাউকে-”

“যেদিন মরে যাবি, সেদিন অবধি এরকম ক্লিশে ডায়লগগুলো দিতেই হবে তোকে, তাই না?” মেয়েটার কথার তোড়ে কথা শেষ হল না অন্যজনের।

ছেলেটা লজ্জা পেয়ে হাসল। সে-ও বিমর্ষ হাসি। একটু চুপ করে থেকে যেন অনেক খুঁজেপেতে আবার একটু হেসে বলল, “আর যাই হোক, তোকে সেই ক্লিশে শুনতে হবে না, এটুকু তো নিশ্চিন্তি!”

মেয়েটা এবার একটু কাছে সরে এল ছেলেটার। হঠাৎ ছেলেটার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, “কিন্তু এই ক্লিশেগুলো না শুনলে আমার ঘুম আসবে কীসে?”

জোরেই হেসে ফেলল ছেলেটা এবার, “শেষদিনেও এই বিচ্ছিরি ওয়র্ড প্লে-গুলো করতে হবে? ক্লিশে আর কীসে! ছি!”

“আর যদি তোর শেষ ক্লিশে ডায়লগবাজি শোনার দিনে তোর পাশে থেকে এভাবেই শব্দ নিয়ে বিচ্ছিরি খেলা করতে চাই?”

“তা কী করে হয়। You know the rules. এক্স-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে ঠাকুর পাপ দেয়, ভুলে গেলি? সেইমতোই তো কথা হল যে এই দেখাই আমাদের শেষ দেখা।”

“আর যদি এক্স না হয়ে আবার নতুন করে তোর এ বি সি ডি হতে চাই?”

“মানে? কী বলছিস এসব! আর রাতুল!”

“দূর বাতুল! ভাঁড় মে যায়ে রাতুল! &… I am sorry! I really am…”

 

সন্ধের অন্ধকারে জগৎ সংসার ভুলে পাথরের বেঞ্চির উপর ঘন হয়ে আসে দুটো ছায়ামূর্তি। ঘন হয়ে জোড়া লাগে ভাঙতে বসা একটা প্রেমের গল্পের শুরু আর শেষ…

 

Advertisements

4 thoughts on “চুপকথাদের রূপকথা (২৯ জানুয়ারি, ২০১৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s