সরস্বতী মহাভাগে (৩১ জানুয়ারি, ২০১৭)

saraswathi_devi_by_ajishrocks-d3e0dnq

 

দুপুরবেলার দিকটা এই বাগানেই সময় কাটে দেবীর। মধ্যাহ্নভোজনের পর ছায়াশীতল এই আম-জাম-বটের মেলায় এক অদ্ভুত শান্তি আর নিস্তব্ধতা খেলা করে বেড়ায়।

প্রত্যহ সকাল থেকে সংসারের খুঁটিনাটি নানা কাজ থাকে। গৃহকর্তা প্রজাপতি ব্রহ্মার চার-চারটে মাথার চারখানা চশমা। ব্রহ্মাণ্ডের জন্মের সময় থেকেই পরমপিতার বয়সটা একটু বেশির দিকেই। প্রায়শই চারখানা চশমার একটা-দুটো খুলে এদিক-ওদিক রেখে দিয়ে তারপর আর খুঁজে পান না। শুধু কি বাড়ির কাজ? তার পাশাপাশি দেবীকে ওসব দিকেও খেয়াল রাখতে হয়।

দুপুরবেলায় খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে আচমন সেরে দেবী তাই পরিচারিকাদের সঙ্গে নিয়ে চলে আসেন এই উদ্যানে। বিশ্বকর্মার নিখুঁত প্ল্যানিংয়ে তৈরি এই বাগানের ঠিক মাঝখানে আছে শান্ত জলের অতল এক পুকুর। তার ঠিক পাশেই সৃষ্টির বয়সের সমান বয়সী এক অশ্বত্থ গাছের তলায় রোজই দেবীর বিশ্রামের আয়োজন করা হয়। আজও তার ব্যত্যয় হয়নি।

বেলা তখন প্রায় তিনটে হবে। হঠাৎ বাগানের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে একটা বাগবিতণ্ডার আওয়াজ ভেসে এল। ভাতঘুমের চটকাটা ভেঙে যেতে বীণাপাণি নিজের মাথার কাছে বসে থাকা পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করলেন, “অসময়ে দেব-উদ্যানে এই গোলমাল কীসের? তোরা কি কেউ আমায় দু’দণ্ড শান্তি দিবি না!”

 
‘লতা’ আর ‘শ্রেয়া’ নামে দেবীর সবচেয়ে প্রিয় দুই সখীই সবার আগে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। দেবী কুপিত হলেই চিত্তির। তেমনটা হলেই মর্ত্যলোকে কোনও না কোনও পরীক্ষার ফলাফল বেরতে দেরি হবে, হাহুতাশ করতে হবে হাজার-হাজার পরীক্ষার্থীকে। একবার মর্ত্যলোকে আরাবুল না কী যেন নামের এক ম্লেচ্ছ কোন এক শিক্ষিকাকে জলের জগ ছুড়ে মেরেছে খবর পেয়ে দেবী এমন ক্রুদ্ধ হলেন, এমন থরথর করে কাঁপতে থাকলেন যে পশ্চিমবঙ্গে প্রাইমারি টেটের রেজাল্ট… সে অবশ্য অন্য গল্প। সেসব কথা অন্য কোনওদিন হবে না হয়!

saraswati-devi

একটু পরেই যুগপৎ লতা ও শ্রেয়া এসে খবর দিল, বাগানের উত্তর-পূর্ব কোণের দ্বারে নাকি ভরদুপুরে কোন এক লালমুখো সাহেব এসে দেবীর দর্শনপ্রার্থনা করেছেন। কিন্তু দেবীর অনুগত রামানুজম, আর্যভট্ট, জগদীশচন্দ্র, রবীন্দ্র ইত্যাদিরা সেসময় ওইদিকেই ছিল। তারাই সাহেবকে আটকেছে। সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এমন অসময়ে মোটেও বিরক্ত করা যাবে না বাগদেবীকে। আইনস্টাইন ছোকরাও সেসময় ওখান দিয়েই যাচ্ছিল। স্বজাতিকে দেখতে পেয়ে সে সদ্য কেনা আইফোন সেভেন এস (এস ফর স্বর্গ) দিয়ে সেই সাহেবের সঙ্গে একখানা সেলফি তুলে নিয়েছে ইত্যাদি…
 

দেবীর আদেশ পেয়ে আইনস্টাইন আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে তার আইফোন সমেত হাজির হল। দেবী সেলফিখানা দেখতে চাইলে সে তাঁর ঝাঁকড়া চুলের মধ্যে থেকে বের করে ফোনখানা দেবীর হাতে দিল। দেবী অবাক হয়ে আইনস্টাইনের মুখের দিকে তাকালে উত্তর এল, “আজ্ঞে আইফোন কিনতে যা খরচ হয়েছে, তারপর আর কভার কেনার জন্য পয়সা ছিল না। অগত্যা চুলেই গুঁজে রাখি। হেঁ হেঁ…”

দেবী আর কিছু না বলে সেলফিখানা খুললেন। সাহেবের মুখখানা দুপুরবেলার রোদে তেতে টকটকে লাল, নাকি ওটা ক্যান্ডিক্যামের নতুন কোনও ফিল্টার, বিশেষ বোঝা গেল না। তবে সাহেব যে ভারি লম্বা, সেই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মাথায় কোঁকড়া চুল, চোখ দু’খানি ক্ষমাসুন্দর ইত্যাদি…

একে যেন স্বর্গলোকেরই কোনও এক ডিপার্টমেন্টে দেখেছেন… মুখখানা খুব চেনা চেনা… ঠিক ঠাহর করতে পারলেন না দেবী। কৌতূহলটা তাই বেড়ে গেল না-চাইতেও। ভাতঘুমটাও ইতিমধ্যে চটকে গিয়েছে। অগত্যা দেবী নির্দেশ দিলেন, “ডেকে আনো সেই সাহেবকে। তাকে বলো শ্বেতবসনা দেবী শ্বেতাঙ্গ সাহেবকে দেখতে চেয়েছেন। অবিলম্বে।”

এবার লীলা আর সুচিত্রা ছুটল। খানিক পরে দেখা গেল ওদের দু’জনের সঙ্গে দূর থেকে হেঁটে আসছেন প্রায় আটফুট লম্বা এক লালমুখো সাহেব। সরস্বতীদেবীর কাছে এসে তিনি প্রথমে বুকে ক্রস আঁকলেন, তারপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিভ কেটে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। দেবী বরাভয় মুদ্রা প্রদর্শন করে সাহেবের আগমনের কারণ জানতে চাইলেন।

সাহেব ভাঙা বাংলায় বলতে শুরু করলেন,
“so… আমি আসিয়াছি একঠি বিশেষ অনুরোধ লইয়া। You see devi, আমি কাজ করিয়া থাকি স্বর্গলোকের international department-এ। কিন্তু সম্প্রতি আমার কাজের pressure… (কথার মাঝেই একবার পকেট থেকে রুমাল বের করে সাহেব কপালের ঘাম মুছলেন) এমন বাড়িয়াছে যে একা হাতে সব সামলাইতে রীটিমটো হিমশিম খাইতেছি।”

st-valentine

দেবী স্মিতহাস্য করে জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু তাতে আমি কী করতে পারি? তুমি বৈকুণ্ঠে শ্রীবিষ্ণুকে খবর দাও না কেন? তিনি হয়তো তোমায় কিছু সুদর্শনা, সুলক্ষণা, বুদ্ধিমতী সহকারিণী জোগাড় করে দিতে পারেন, যারা তোমার কাজের ভার লাঘব করতে পারবে। তা বাছা, তোমার কাজটা ঠিক কী? তুমি আমার কাছেই বা এলে কেন হঠাৎ? জানতে বড় ইচ্ছে হয়।”

সাহেব আরও একবার রুমালে মুখ মুছে বললেন, “Ya ya I have been there. বৈকুণ্ঠেই আগে গিয়াছিলাম। lord শ্রীবিষ্ণুই হামাকে টুমার কাছে পাঠাইয়াছেন। তাঁরই নির্দেশে আমি টুমার সঙ্গে নিজের কাজ ভাগ করিয়া লইতে আসিয়াছি। সেই নীল ঠাকুর বলিলেন, তোমার পুজোর দিনেই মর্ত্যলোকে ছেলে-মেয়েদের স্কুলের গেটস হাট করিয়া খোলা ঠাকে। আমার কাজের জন্য যা একেবারে আদর্শ পরিবেশ। heh heh heh…”

এবার দেবীর জিভ কাটার পালা। তিনি সবিস্ময়ে বললেন, “স্বয়ং নারায়ণ তোমায় পাঠিয়েছেন তোমার কাজে আমাকে অংশীদার করতে চেয়ে? তা বাছা, কী নাম গো তোমার? সেটাই তো জানা হয়নি এখনও!”

সাহেব ধপ করে মাটির উপরেই বসে পড়লেন। ফের একবার রুমালে মুখ মুছলেন। অতঃপর পকেট থেকে একগোছা লাল গোলাপ বের করে সটান দেবীর দিকে এগিয়ে দিয়ে ভীষণ লজ্জা-টজ্জা পেয়ে আরও একপ্রস্থ লাল হয়ে বললেন, “আজ্ঞে, হামার নাম Valentine. Saint Valentine.”

 

Advertisements

2 thoughts on “সরস্বতী মহাভাগে (৩১ জানুয়ারি, ২০১৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s