আমি আর আমার বন্ধু (ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)

Jadavpur_University_Gate_No._4

আমি যখন যাদবপুরে পড়তে এলাম, তার বেশ ক’মাস আগে থাকতেই আমার একজন বন্ধু হয়েছিল। ছোট মফসসল শহরের ছেলে, ক্লাসে মোটামুটি ভালই র‍্যাঙ্ক-ট্যাঙ্ক করে এসেছে বরাবর, আত্মীয়স্বজনের খুব ইচ্ছে, ছেলে (মানে আমি) জাঁকিয়ে জয়েন্ট দিয়ে গলায় স্টেথো ঝোলাবে। কিন্তু এই ছেলের কপালেই লেখা ছিল কলিযুগে যদুবংশের ঠিকানাকে আপন করে নেওয়া। বিধির বিধান, খণ্ডাবে কে? ভাগ্যিস কপালে লেখা ছিল অমন কিছু। নইলে কি আর দেখা হত সেই বন্ধুর সঙ্গে?

 

২০০৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সুযোগ পেয়েছিলাম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজি আর সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে একবার ঢুঁ মারার। যদ্দুর মনে পড়ে, তিনদিনের জন্য সারা রাজ্য থেকে প্রায় গোটাপঞ্চাশ ছেলেমেয়েকে তাদের মা-বাবাসমেত রীতিমতো যাতায়াতের ভাড়া, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, সবটা সামলে নিয়ে আসা হয়েছিল কলকাতা শহরে। তার আগে ১৮ বছরে আমি একবারই কলকাতায় এসেছিলাম। কিন্তু সেবারে ছোট্ট আমার স্মৃতিশক্তি এতটাও পোক্ত হয়নি, যা দিয়ে একটা শহরকে মনে রাখা যায়। সুতরাং ওই মাধ্যমিকের পরই প্রথমবার সজ্ঞানে আমার কলকাতা আসা, প্রথমবার হাওড়া স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে ইয়াব্বড় হাওড়া ব্রিজ দেখে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যাওয়া, আর হোটেল থেকে প্রথম গন্তব্য, আইআইসিবি। সেখান থেকে পায়ে হাঁটা দশমিনিটের পথ সিজিসিআরআই। ওটুকুও আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাসে করে। ওই বাসে যাওয়া-আসার পথেই সদ্য আলাপ হওয়া বন্ধুদের কেউ-কেউ চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘এই দ্যাখ, এইটা যাদবপুর, এইটাই যাদবপুর ইউনিভার্সিটি!’ আমার চেহারা বরাবরই ছোটখাটো, ভিড় ঠেলে বাসের জানালা অবধি পৌঁছতে পারিনি। কোনওরকমে ফাঁকফোঁকর দিয়ে শুধু দেখতে পেয়েছিলাম, লম্বা একটা পাঁচিল। ক’দিন পর ইন্টারনেটে ইউনিভার্সিটির ছবি দেখার আগে অবধি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমি জানতাম ওই একটা বিবর্ণ পাঁচিলকে। মজার এই কথাটা সবার আগে জানিয়েছিলাম আমার সেই বন্ধুকেই।

 

সে যাইহোক, ওই তিনদিনের সেমিনারেই মাথার মধ্যের বিপ্লবী, বিজ্ঞানী পোকাটা কুটকুটিয়ে উঠেছিল। দুই ইনস্টিটিউটের বাঘা-বাঘা অধ্যাপক ও বিজ্ঞানীরা বিলক্ষণ জানতেন, একেবারে প্রথম সারির এই ছেলেমেয়েদের অর্ধেকেরও বেশি উচ্চমাধ্যমিকের পর চলে যাবে আইআইটি কিংবা মেডিক্যাল কলেজগুলোয়। তবু তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন, বিজ্ঞানসাধনার গুরুত্বটা আমাদের এবং আমাদের মা-বাবাদের বোঝাতে। সেই সেমিনারে আমার সঙ্গে সমবয়সি যারা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে ক’জন সেই গুরুত্ব বুঝে শেষমেশ বিজ্ঞানকে ভালবেসেছিল, জানা নেই। আমি কিন্তু ঠিক করে নিয়েছিলাম, আমি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হব না। বিজ্ঞানই পড়ব। আর যাদবপুরে পড়ব। পড়বই। দেখা করবই করব আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে।

Jadavpur_University_Arts_Gachchtola

তারপর কী হল, আমার প্রিয় বিষয় ফিজ়িক্স ছিল এবং আমি প্রেসিতে পরীক্ষা দিয়ে ফিজ়িক্সে সুযোগ পেয়েও স্রেফ যাদবপুরে পড়ার লোভে যাদবপুরে ফিজ়িক্সে চান্স না পেয়েও ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, কেমিস্ট্রিই বা মন্দ কী!’ বলে কীভাবে সেই যাদবপুরেই এসে পড়লাম, সেসব বিস্তারিত গল্পের এখানে পরিসর নেই। আমি বরং একটু-একটু করে আমার সেই বন্ধুর কথায় আসি। তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময়। সে-ই আমাকে লোভ দেখিয়েছিল যাদবপুরে আসার। দু’জনে মিলে রাতের পর-রাত একসঙ্গে প্ল্যান করতাম, উচ্চমাধ্যমিকে কোন সাবজেক্টে কত পেলে কাটঅফ কত-য় গিয়ে দাঁড়াবে? কত পেলে ফিজ়িক্স পাব, কত পেলে পাব কেমিস্ট্রি। অঙ্কে যদি একটু কম উঠেও থাকে, অন্তত জিওলজিতে তো হয়েই যাবে। সে হয় হোক, কিন্তু যাদবপুরেই পড়া চাই। দেখা হওয়া চাই দু’জনের।

 

তারপর যাদবপুরে কেমিস্ট্রি নিয়ে ভরতি হলাম ২০১০ সালে। বহু প্রতীক্ষার অবসানে সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই। তারপর ধীরে-ধীরে সে-ই আমাকে হাতে ধরে শেখাল, মাঝে-মাঝে একটা-দুটো ফিজ়িক্স ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ‘ঐতিহ্যবাহী সেতু’তে বসে গুলতানি মারলে মস্ত বড় কিছু পাপকাজ হয়ে যায় না। অঙ্কের পরপর দুটো ক্লাসের যে কোনও একটা বাঙ্ক করে শ্যামলদায় ঢুঁ মেরে আসা যে একরকম বাধ্যতামূলক, সে-ও জানলাম তার কাছেই। আমার এই বন্ধু ছিল ভারি মিশুকে। ক্লাসের সবার সঙ্গেই তার তুমুল দোস্তি হয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনি। পাঁচতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে প্রথম সেম-এ অনেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করে, আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি। ফলে যা হয়! প্রথম সেমের রেজ়াল্ট জুড়ে ইংরেজি বর্ণমালার চতুর্থ বর্ণের অনিবার্য ছড়াছড়ি! সেসময়ও পাশে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত রেখে কোনও কথা না বলেও ‘কোনও ব্যাপার না, আরও পাঁচখানা সেম আছে তো মেকআপ দেওয়ার জন্য,’ এই আশ্বাসটা দিয়েছিল ওই বন্ধুই।

Bridge_over_Garden_Pond_-_Jadavpur_University_-_Kolkata_2015-01-08_2351

ফিবছর রিইউনিয়নের দিনটায় সেই বন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয়। যার সঙ্গে সাড়ে তিনবছর আমি কাটিয়েছিলাম ইউজি আর পিজি বিল্ডিংয়ের আনাচে-কানাচে। যে সাক্ষী ছিল এপ্রিল-মে মাসের অসহ্য গরমে ইনঅরগ্যানিক ল্যাবে দরদর করে ঘেমে আমার সল্ট অ্যানালিসিসের। ফিজ়িক্যাল কেমিস্ট্রির প্রতি আমার পক্ষপাতিত্বের কথাও প্রথম জেনেছিল সে-ই। যদিও সে বেচারার পক্ষেও সম্ভব হয়নি সাড়ে তিনবছরেও আমাকে বুঝিয়ে ওঠা, অরগ্যানিক কেমিস্ট্রি ব্যাপারটা ঠিক কী? কী করেই বা ইনঅরগ্যানিকের গ্র্যান্ড ভাইবায় অন্তত একটা প্রশ্ন পেরে আসা যায়। হ্যাঁ, আমি সত্যিই ইনঅরগ্যানিকের গ্র্যান্ড ভাইবায় একটা সিঙ্গল প্রশ্নের উত্তরও পারিনি। সাত-আটটা প্রশ্নের উত্তরে ব্ল্যাকবোর্ডে আমার ব্যর্থ হাঁচড়পাঁচড় দেখে কোনও একজন স্যার দয়াপরবশ হয়ে বলেছিলেন, ‘একে ছেড়ে দাও। বেকার সময় নষ্ট হচ্ছে।’ পড়াশুনোর বাইরে যা কিছু করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, যা একটু-আধটু ফেস্টে অংশ নিয়েছিলাম, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় সেই যে ফ্রেশার্সদের জন্য নবীনবরণ অর্গানাইজ় করা, রসায়ন বিভাগের মারাত্মক চাপ সামলেও ইউনিয়ন রুমে গিয়ে ঘরটাকে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভরিয়ে তোলা, এসি ক্যান্টিনে যে আদৌ কোনও এয়ার কন্ডিশনার নেই, সেটা আবিষ্কার করে বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণায় ভোগা… সমস্তটার সাক্ষী ছিল আমার সেই বন্ধু।

 

কেমিস্ট্রির সঙ্গে সারা জীবন কাটাব, খুব একেবারে বিদেশ-টিদেশ গিয়ে পিএইচডি করে ফাটিয়ে দেব, আমার এই স্বপ্ন শেষমেশ সত্যি হয়নি। কেমিস্ট্রির সঙ্গে দেখেশুনে বিয়ে হয়েছিল। তিন-সাড়ে তিনবছর ঘর করার পর একদিন হঠাৎই সংসার ছেড়ে পালিয়েছিলাম। তারপর যেটা হয়েছিল, সেই কথাটা ভেবে আজও ভাল লাগে, যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই লাগবে। কত পড়াশুনো জানা, জ্ঞানীগুণী অধ্যাপক-অধ্যাপিকারা আমাদের রসায়ন বিভাগের, তাঁদের প্রায় কেউই কিন্তু আমার এই পালিয়ে যাওয়া দেখে গালমন্দ করেননি। দুঃখ পেয়েছিলেন হয়তো, কিন্তু অন্তত নিজেদের চোখেমুখে সেটা ফুটিয়ে তোলেননি কেউই। চাকরি পাওয়ার পর ভয়ে-ভয়ে গিয়েছিলাম ডিপার্টমেন্টে, স্যার-ম্যাডামদের সঙ্গে দেখা করতে। ভয় ছিল, কপালে নাচছে ভয়ঙ্কর ভর্ৎসনা। কিন্তু লেখালিখিটাই আমার ভাল লাগে, সেই সংক্রান্ত একটা চাকরিতেই যে আমি ঢুকেছি, একথা জেনে প্রত্যেকেই পিঠ চাপড়ে উৎসাহ দিয়েছিলেন। সবার প্রশ্ন ছিল, ‘তুই খুশি তো? ব্যস!’ মস্ত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত শিক্ষক, গবেষক সকলে। তবু সময় করে কেউ-কেউ এখনও আমার লেখা পড়েন। সময় বের করে সোশ্যাল মি়ডিয়া মারফত সেকথা আমাকে জানাতেও ভোলেন না (দেবজ্যোতি স্যার, পার্থ স্যাররা যেমন)। সবে লিখতে শুরু করেছি, জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিও প্রায় শূন্য এই বয়সে… এই সামান্য সম্বল নিয়ে কী-ই বা এমন পারি… তবু তাঁরা উৎসাহ দেন। এই তো গত মাসেও এক রেস্তরাঁয় দ্যাখা হয়েছিল সমরেশ (ভট্টাচার্য) স্যারের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর তিনবছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে, স্যার কিন্তু আজও মনে রেখেছেন আমার নাম, আমি কোথায় কাজ করি, তার সবটাই।

Jadavpur_University_UG_Science

সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে ইউনিভার্সিটি চত্বরে যাওয়া কমে গিয়েছে অনেকটাই। কিন্তু আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ আছে এখনও। তার সম্পর্কে আজও কেউ একটা বাজে কথা বলেই দেখুক না! বৃষ্টিদিনেও তার জন্য ভিজে-ভিজে মিছিল করার জন্য রবীন্দ্রসদন পৌঁছে যাব ঠিক। সে না থাকলে কে আমার আলাপ করিয়ে দিত যাদবপুরের রসায়ন বিভাগের সঙ্গে? সে না থাকলে সেমের আগের স্টাডি লিভে কার প্রশ্রয়ে সারা সন্ধে বসে থাকতাম প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে? সাইকেলে চেপে সিকিউরিটি গার্ডরা এসে মাঠের চারপাশে ঘুরে-ঘুরে সুর করে ‘উঠে পড়ুন’ হেঁকে গেলেও কে চোখ টিপে উসকানি দিত, ‘আরেকবার ঘুরে আসতে দে না মালটাকে!’?

 

আমার সেই একমেবাদ্বিতীয়ম বন্ধুটির নাম যাদবপুর ইউনিভার্সিটি। যার সঙ্গে ইন্টারনেট মারফত আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল সেই ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময়। যার জন্যই আলাপ হয়েছিল সারা দেশের গর্ব ‘যাদবপুর রসায়ন বিভাগ’-এর সঙ্গে। যার সঙ্গে আর কখনও দেখা হোক ছাই না-হোক, ফিবছর আমার ঠিক দেখা হয়ে যায় এই রিইউনিয়নের দিনটায়।

 

partner

Advertisements

7 thoughts on “আমি আর আমার বন্ধু (ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s