কবে অপরাধ, কবে তার শাস্তি (৪ এপ্রিল, ২০১৭)

il_340x270.1100546449_jfhpএক ভদ্রলোকের গল্প। যাঁর জীবনটা ভারি গোছানো। কীরকম, জানতে চাও? গোড়া থেকেই বলি তবে। এই যেমন ধরো সকালবেলার দিকে পরপর ক’দিন তাঁর বাড়িতে উঁকি মারলেই জানতে পারবে যে তিনি তাঁর মাথার চুলের খুব যত্ন করেন। নিয়মিত ব্যবধানে দামি শ্যাম্পু, সুগন্ধী তেল, মখমলি কন্ডিশনার মাথায় দেন। রোজ স্নানের পর অনেকটা সময় নিয়ে হাতির দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ান। ঠিক তেমনই যত্ন তিনি নেন তার মুখমণ্ডলেরও। সকলের নজর এড়িয়ে চুপিচুপি ভদ্রলোকের বাড়ির ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার হাঁটকালে সাতরকমের ক্রিম আর তিনধরনের পাউডার তো পাবেই, উপরন্তু ওঁর শেভিং কিটের প্রত্যেকটি উপকরণ রীতিমতো ঈর্ষণীয় রকমের সুগন্ধী! ফলত ভদ্রলোক যখন নাহা-ধো-কে, সুট-বুট, জুতো-মোজায় সুসজ্জিত হয়ে রাস্তায় বেরন, তাঁর দিকে যে তখন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে, তাতে আর আশ্চয্যি কী! কেউ-কেউ তো সবিস্ময়ে সেলামও ঠোকে। ভদ্রলোকের চওড়া বুক আরও চওড়া হয়ে যায়। গটমট তিনি হাঁটা দেন অফিসের দিকে।

তারপর যদি কেউ সেই লোককে কোথাও কথা বলতে শোনো, তা হলে তো আরওই ব্যোমকে যাওয়ার কথা। কাজের জায়গাতেও অবস্থা বুঝে কখনও তিনি কথা বলছেন অত্যন্ত মার্জিত ভাষায়, কখনও আবার সেই একই লোক স্রেফ কিছু কড়া শব্দের সাহায্যে প্রতিপক্ষের উপর হানছেন তীব্র কশাঘাত! অমন সুবক্তা সত্যিই বড় সহজে চোখে পড়ে… থুড়ি, কানে আসে না। বয়ঃজ্যেষ্ঠদেরকে যেখানে যথাযথ সম্বোধন করার কথা, সেখানে তাই করছেন, কনিষ্ঠদের সঙ্গে মিশছেন ঠিক ততটাই হাসি-খুশি হয়ে। সারাদিনে কাজের ফাঁকে সময় করে তিনি খোঁজ নেন ছেলে-মেয়েদের। গিন্নি বাড়িতে বসে একলা বোধ করছেন না তো? ঠিক-ঠিক সময়ে ভদ্রলোক ফোন করে নেন তাঁকেও।

বিকেলে কাজ শেষ হওয়ার পর একবার সহকর্মীদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বসেন তিনি। বা রে! আগামিকাল কী-কী কাজ হবে, সেটা একবার ছকে নিতে হবে না? কোনও কাজ ফেলে রাখার তিনি মানুষ নন। হুঁ হুঁ বাওয়া! অফিস থেকে বেরিয়ে তিনি সোজা এসে ওঠেন তাঁর নিজের হাতে গড়া স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে। খোঁজ নেন আজ সারাদিনে মোট কত টাকা জোগাড় করতে পেরেছে সংগঠনের ছেলে-মেয়েরা। তারপর হিসেব কষা হয়— এই পরিমাণ টাকায় কত প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা যাবে? কতগুলো রক্তদান শিবির আয়োজন করা সম্ভব এই দিয়ে? কতগুলো পাড়ায় সভা করে প্রচার করা যেতে পারে নারীসুরক্ষা বিষয়ে?

 চিন্তিত মুখে ভদ্রলোক অবশেষে বাড়ির দিকে হাঁটা দেন। ততক্ষণে নিঝুম হয়ে এসেছে পাড়া। ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে ধীর পায়ে এগিয়ে যান তিনি বাড়ির দিকে। ছেলে-মেয়েদুটো হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটাই বড় ছেলেটার চেয়ে। তার জন্য আজ একটা নতুন স্মার্টফোন কিনে এনেছেন ভদ্রলোক। আজকাল স্মার্টফোন না থাকলে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদীক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। আর পথেঘাটে আপদে-বিপদেও তো কত কাজে আসে জিনিসটা! মেয়ের জন্য তাই সারপ্রাইজ় গিফ্‌টের ব্যবস্থা করেছেন দায়িত্বশীল বাবা।

562270-406242-rapebanglesbroken

 ঘরে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে রাতের খাওয়া সেরে নেন ভদ্রলোক। স্ত্রী রোজ তাঁর জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করেন। স্বামী ফিরলে দু’জনে একসঙ্গে খেতে বসেন। তারপর শোওয়ার ঘরে চলে যান। ছেলে-মেয়েরা উপরতলায় নিজেদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। স্বামী-স্ত্রীতে একথা-সেকথা হতে থাকে টুকটাক। পাঁচ-দশমিনিটের বেশি অপেক্ষা করতে হয় না। হঠাৎ স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেন স্বামীটি। তেমন কোনও ভয়ঙ্কর কারণ থাক ছাই না থাক, একটা কিছু ছুতো ঠিক পাওয়াই যায়। অতঃপর দাবানলের আগুনের মতো হু হু করে রাগ বাড়তে থাকে ভদ্রলোকের। মদের নেশায় কি? উঁহু। মদ তিনি ছোঁন না। তবে? সহধর্মিণী জানেন, রাত্রিবেলা এইটুকু হাতের সুখ করতে না দিলে তার স্বামীটির নিশ্চিন্তি ঘুম আসবে না। তিনি, অতএব, মুখ বুজে সহ্য করে নেন সব। যেটুকু বাধা না দিলে জড়পদার্থের সঙ্গে তফাত থাকত না, সেটুকুই দেন। কিছুক্ষণ অকথ্য গালাগালি, চুলের মুঠি ধরে টান, হাত মুচড়ে দেওয়ার পর তৃপ্ত স্বামী উলটোদিকে মুখ করে শুয়ে পড়েন। বউ ঘাড়ে-মাথায় একটু জল দিয়ে এসে শুতে যাওয়ার সময় খেয়াল করেন, আলনার উপর স্বামীর ছেড়ে রাখা প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়ে নীচে মেঝেয় পড়েছে একটা ভাঁজ করা কাগজ। কাল সন্ধেয় বেহালায় তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের জন্মদাতা একটি সভা করবেন। সভার বিষয়, ‘মেয়েদের সমানাধিকার’। ভাঁজ করা কাগজে সেই সভায় ভদ্রলোকের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ, লিখে রেখেছেন তিনি নিজেই। কাগজখানা ভাঁজ করে আবার প্যান্টের পকেটে রেখে দিতে গিয়ে ভদ্রমহিলার হাতটা ব্যথা করে ওঠে। আজ একটু বেশিই জোরে মুচড়ে দিয়েছেন ভদ্রলোক, তাই আর কী…

 

আমার দেশের অবস্থা আজ ঠিক এই ভদ্রলোকটির মতোই নয় কি? তার সুজলা-সুফলা মাটির উপরে দুমদুম করে ছুটছে উন্নয়নের রেল। মাটির তলায় লম্বা লম্বা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তৈরি হচ্ছে চোখধাঁধানো রাস্তা। আকাশ-মহাকাশে একের পর এক তাক-লাগানো যান পাঠাচ্ছে সে। তুড়ি বাজিয়ে কিনে ফেলছে মারাত্মক সব ক্ষেপণাস্ত্র, ভুঁড়ি বাজিয়ে চাকরকে পাঠাচ্ছে জিও-র সিম তুলে ফোরজি বিপ্লবে সামিল হতে। এই কোথাও শিবঠাকুরের আকাশছোঁয়া মূর্তি তৈরি হচ্ছে, তো কোথাও ‘ইভটিজ়ার কেষ্টঠাকুর’-কে ইভটিজ়ার বললেই রে-রে করে উঠছেন দেশের নেতা-মন্ত্রীরা। শক্ত হাতে নোট বাতিলের মতো একটা অসাধ্য সাধনও কিনা করে দেখিয়ে দিল আমার দেশ! টাকা পালটাতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কারও জীবন ফুরিয়ে গেল, কেউ আবার জিও-র সিম তোলার লাইনে দাঁড়িয়ে চোখ টিপে হেসে বলে ফেলল, ‘ফোরজি-ই তো জীবন কাকা!’

 

চোখের সামনে আমার দেশের এত কাণ্ড, এত দাপট দেখে বিশ্বের তাবড়-তাবড় শক্তি অবধি মাথা ঝুঁকিয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছে, ‘হুঁ, ইন্ডিয়া এগোচ্ছে বই কী!’ তাঁরা থোড়াই শুনেছেন প্রদীপের তলায় অন্ধকারের প্রাচীন প্রবাদ? শুনলে নিশ্চয়ই মহারাষ্ট্রের স্বাতী জামদাড়ের নামও শুনতেন।

 India_outline

সেই মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল। প্রথম সন্তান মেয়ে। দ্বিতীয়টিও তাই। তৃতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর আলট্রাসাউন্ড করতে গিয়ে যখন জানা যায়, এবারেও গর্ভস্থ ভ্রূণটি একটি কন্যাসন্তান— স্বাতীর শ্বশুরবাড়ির কেউই চাননি এই সন্তান পৃথিবীর আলো দেখুক। এদেশে যদিও আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে ভ্রূণের লিঙ্গ জেনে ফেলা আইনবিরুদ্ধ। তা, প্রচণ্ড বড়লোক এবং হদ্দ গরিব, সমাজের এই দুই সদস্য কবেই বা আইনের পরোয়া করেছে! অতএব গরিব চাষির বউ স্বাতী জামদাড়ের গর্ভপাত করানো হল। সেই করতে গিয়ে মেয়েটি মারা গেল। তারপর তার ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেটও তৈরি হল। এই অবধি সব ঠিকঠাকই চলছিল। গোলমাল হল মেয়েটির বোকা বর নিজের সদ্যমৃতা স্ত্রী-র মৃতদেহ নিয়ে শহরের হাসপাতালে এসে পৌঁছনোয়। প্রবীণ জামদাড়ে নামের সেই লোক হাসপাতালের এক ডাক্তারবাবুকে অনুরোধ করে, তার শ্বশুরবাড়ির লোক এসে না পৌঁছনো অবধি যেন হাসপাতালের মর্গে তার স্ত্রীর মৃতদেহ রাখা হয়। লোকটির কথা শুনে এবং ডেথ সার্টিফিকেট দেখে সেই ডাক্তারবাবু পুলিশে খবর দেন। তারপর পুলিশি তৎপরতায় কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসে কেউটে। জানা যায়, বেআইনি গর্ভপাতের আস্ত একটা চক্র কাজ করে মহারাষ্ট্রে। একের পর-এক যে চক্রের সদস্যরা গত ক’মাস হল ধরা পড়ছে পুলিশের জালে। যাঁকে নিয়ে এত কথা, সেই স্বাতী যখন মারা যায়, ঠিক আমারই বয়সি ছিল সে। মাত্র ২৫টা বসন্ত দেখা হয়েছিল এই জীবনে। যে অভিশপ্ত নারীজীবনে সে পেটে ধরেছিল তিন-তিনটে অলক্ষুণে মেয়ে।

 

crisis-pregnancy-centres

এই দেশে কোনওদিন ধর্ষণ বন্ধ হওয়া সম্ভব? এত্তবড় দেশের সামান্য কিছু মানুষ শিক্ষিত। তারা পড়ছে, তারাই লিখছে, টাকা কামাচ্ছে, থ্রিজি থেকে ফোরজি হয়ে তারা ক্রমশ আরও-আরও উপরে উঠছে সমাজে। বাদবাকি বিশাল সংখ্যক মানুষ পড়ে রয়েছে অশিক্ষার অন্ধকারে। পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে হবে বলে একটি মেয়েকে ঘরে আনা দরকার, অথচ সেই মেয়ে নিজে কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেই সর্বনাশ! ছেলে-মেয়ের সংখ্যার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, সমাজে, প্রকৃতিতে, সর্বত্র মেয়েদের ঠিক কতখানি প্রয়োজন, এসব কথা ওই লোকগুলো অতএব বুঝবে না কোনওদিন। আর ওদের এই অশিক্ষা, অজ্ঞানতায় ইন্ধন দিয়ে যাবে কুশিক্ষিত আর-একদল মানুষ, লোভের বশবর্তী হয়ে যারা সাহায্য করবে ওই অসহায় মূর্খদের। তাদের টাকা পেলেই হল। কার বাড়ির বাচ্চা মারতে গিয়ে তার বউ বাঁচল কি মরল, সে জেনে ওরা কী করবে?

 

rape-023

একটা আস্ত কন্যাভ্রূণহত্যা চক্র! তবু তো এই একটার কথা আজ আমাদের কানে এসে পৌঁছেছে… চোখের আড়ালে, এদেশের অলিগলিতে কিলবিল করছে না জানি এমন আরও কত! এদেশেই নাকি ঘটা করে দুর্গাপুজো হয়। কালীপুজো হয়। সরস্বতী পুজোও হয়। হয় লক্ষ্মীর আরাধনা! আবার এই একই দেশে মেয়েরা জন্মাতেই পারে না। জন্মালেও লাথি-ঝাঁটা খায়। নিঘঘাত যেমনটা খেতে হয়েছে (এবং ভবিষ্যতেও হবে) স্বাতীর দুই বড় মেয়েকে। অবশ্য যারা জন্মালই না, তাদের এক দিক থেকে ভাগ্যবতীই বলতে হবে। কারণ এই একই দেশে যে অভাগা মেয়েরা জন্মেছে, মাত্র এক-দু’বছর বয়স থেকে আজীবন তাঁদের সিঁটিয়ে থাকতে হয়েছে পুরুষের নোংরা লালসার ভয়ে। যে নখ-দাঁতসর্বস্ব পুরুষমানুষ রেয়াত করে না একবছরের শিশুকন্যা থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ্ব সন্ন্যাসিনী— কাউকেই!

rape-featured

মাত্র ২৫ বছর বয়স ছিল মেয়েটার। আর একেবারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধটা কী ছিল? পরপর তিনটে মেয়ের জন্ম দিতে চাওয়া? উঁহু। তার চেয়েও সাংঘাতিক, একেবারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ তো অনেক, অনেক বছর আগেই করেছিল সে।

২৫ বছর আগে এদেশের মাটিতে মেয়ে হয়ে জন্মেছিল, এই কি সে যথেষ্ট গুরুতর অন্যায় করেনি??

Advertisements

2 thoughts on “কবে অপরাধ, কবে তার শাস্তি (৪ এপ্রিল, ২০১৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s