আত্মহত্যা (১৯ এপ্রিল, ২০১৭)

suicide-hanging-knotফাঁসটা দিব্যি শক্ত হয়েছে। এবার বাইরের ঘর থেকে গোল-মাথা লম্বা টুলটা এনে খাটের উপর দাঁড় করিয়ে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়লেই হয়। কিন্তু টুলটা এখন এঘরে এনে ঢোকালে মুশকিল। মার চোখে পড়লে কৈফিয়ত চেয়ে কান ঝালাপালা করবে। নোংরা টুলটা সটান খাটের উপর তুলে ফেলতে চাইছি জানলে এক বা দু’পাটি চটিও উড়ে আসতে পারে।

মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর তফাত এই যে একমাত্র সে ছাড়া আর কেউই নিজের জীবনটা নিজে হাতে শেষ করে দিতে শেখেনি। যে সাঁতার জানে না, ভুল করে জলে পড়ে গিয়ে হয়তো সে ডুবে মরেছে, পা পিছলে অনেক উঁচু পাহাড় থেকে খাদে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে হয়তো ছাতু হয়েছে কেউ, কেউ আবার ঝড়ের রাতে মাথায় বাজ পড়ে অক্কা পেয়েছে হয়তো বা— কিন্তু মানুষের মতো মাথা খাটিয়ে, ছক কষে নিজের জীবনটা নিজে এক লহমায় শেষ করে দেওয়ার বুদ্ধি ভগবান দেননি আর কোনও প্রাণীকেই।

আমি অবশ্য এতশত জানি না। আমার সমস্যাটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত। এবং আমার মনে হয় না সেই সমস্যার গভীরতা বোঝার ক্ষমতা আমার আশপাশের কারও আছে। ক্লাসের বান্ধবীরা অনেক বুঝিয়েছে আমাকে। রিমঝিম কাল রাতে ফোন করে কথা বলেছে অনেকক্ষণ। স্কুলে আজ পুরো সময়টা একমুহূর্তের জন্য আমাকে একা হতে দেয়নি ওরা কেউ। সঙ্গীতা তো সাইকায়াট্রিস্টের কাছে যেতেও বলল। কিন্তু ওরা কেউ জানে না, আমার মনের অবস্থাটা এখন ঠিক কেমন।

love-Breakup-picture

কী করেই বা বুঝবে? আয়ুষকে যে আমি ঠিক কতটা ভালবাসি, ও নিজেই সেটা বুঝতে পারল না তো আর অন্য কেউ কী বুঝবে? রুহি ঠিকই বলে, এই পৃথিবীতে সত্যিকারের ভালবাসার কোনও দাম নেই। এইজন্যই সেই ক্লাস ফাইভ থেকে এই ক্লাস নাইন অবধি রুহি-ই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার প্রথম শরীর খারাপ, প্রথম নিষিদ্ধ বই পড়া, প্রথম নিষিদ্ধ ছবি, আর… আর প্রথম প্রেম, আমার আয়ুষ… সবটাই প্রথম আমি জানিয়েছি রুহিকেই।

কিন্তু আজ আমি যেটা করতে চলেছি, সেটা অবশ্য রুহিও জানে না। আমি কোত্থাও কিছু লিখেও রাখলাম না। লিখলেও বা কী লিখব? সবাইকে নিজের হাতে লিখে জানিয়ে দিয়ে যাব, কীভাবে গতবছর সরস্বতী পুজোর দিন প্রথমবার আয়ুষকে দেখার পর থেকেই ওর প্রেমে তিলে-তিলে মরেছি আমি? কীভাবে একটু-একটু করে নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে আয়ুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি! কীভাবে অবশেষে গত পরশু খুব সাহস করে জানিয়েছি ওকে, বেস্ট ফ্রেন্ডের চেয়েও অনেক বেশি ও আমার কাছে!

আর ও? ও কী করল? পরিষ্কার বলে দিল, সামনেই মাধ্যমিক। জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা, তা ছাড়া এটা নাকি প্রেমই নয়, ইনফ্যাচুয়েশন, ওর চেয়েও অনেক ভাল ছেলে নাকি আমার জীবনে আসবে etc etc কী না বলে গেল আয়ুষ! অনেক চেষ্টা করেও আমি চোখের জল আটকাতে পারিনি। আয়ুষ সেটা দেখেও না দেখার ভান করে মুখ ফিরিয়ে চলেও গেল! রাতে মেসেজ করেছিল। গতকালও করেছিল। আমি রিপ্লাই দিইনি। যার সঙ্গে সারা জীবন নিজের সমস্ত কথা ভাগ করে নেব ভেবেছিলাম, এক ঝটকায় কেমন অবলীলায় আমার সেই স্বপ্ন চুরচুর করে ভেঙে দিল সে নিজেই…

favim-com-beautiful-life-photography-322108

যাক, আর দেরি নয়। সাইকায়াট্রিস্টই বা কী করবে? জীবনটা যে কত দামী, সেকথাই বোঝানোর চেষ্টা করবে তো? কিন্তু আমি তো জানি, আয়ুষকে ছাড়া আমার এই জীবনের কানাকড়িও দাম নেই। আমি জানি, এই সময়টা মা একটু বাইরে যায় রোজ সন্ধেয়। আজও যাবে। চুল আঁচড়াচ্ছে এখন পাশের ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনেটায় দাঁড়িয়ে। পারলে আমাকে ক্ষমা কোরো মা। কিন্তু আমার এই জীবন রাখার আর কোনও মানেই হয় না মা গো, কোনও মানেই হয় না…

 

*             *           *           *           *           *           *           *           *             *           *        *

ডক্টর আয়ুষ সান্যাল গল্পটা শেষ করলেন। উলটো দিকের সোফাটায় বসে থাকা তাঁর মেয়ে, শ্রীনিকেতন শিক্ষায়তন ফর গার্লস-এর ক্লাস টেনের ছাত্রী শৈলী চোখ মুছে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তোমাকে কেউ কিছু বলেনি তারপর?’’

ডক্টর সান্যাল ম্লান একটা হাসি হেসে বললেন, ‘‘কী বলবে? ও তো কোথাও কিছু লিখে যায়নি। কিন্তু বন্ধুবান্ধবরা সবাই জানত, কারণটা কী। পরদিন কাগজেও অমন ভাবেই বেরিয়েছিল খবরটা, ‘প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আত্মঘাতী কিশোরী’। কার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এমন চরম সিদ্ধান্ত, তা অবশ্য লেখা হয়নি কোথাও।’’

শৈলীর মুখে রা নেই। মাথাটা নুইয়ে বুকের সঙ্গে মিশে গিয়েছে প্রায়। আর দু’চোখ থেকে টপটপ ঝরে পড়ছে জল। ডক্টর সান্যাল কিছু বললেন না। একটু সময় নিয়ে মেয়েকে কাঁদতে দিলেন। তারপর নিজের রুমালটা এগিয়ে দিলেন মেয়ের দিকে, ‘‘চোখটা মোছো। ছিঁচকাদুনে বাচ্চাদের মতো না কেঁদে এসো আমার সঙ্গে। আলাপ করিয়ে দেব একজনের সঙ্গে।’’

লম্বা একটা কোরিডরের শেষে একটা আলাদা ওয়ার্ড। মানসিক রুগিদের এখানেই রাখা হয়। তিনটে ঘর পেরিয়ে চার নম্বরটার সামনে এসে দাঁড়ালেন ডক্টর সান্যাল। দরজায় লাগানো কাঁচের জানলাটা দিয়ে ঘরে উঁকি দিতে বললেন শৈলীকে। শৈলী দেখল, ঘরের মধ্যে কোনও খাট, চেয়ার, টেবিল কিচ্ছু নেই। এক কোণায় এক বয়স্ক মহিলা বসে আছেন মেঝের উপর। তাঁর এক পায়ে একটা শিকল বাঁধা, যার অন্য প্রান্তটা আটকানো আছে ঘরের অন্য কোণে মেঝেয় পোঁতা একটা আংটায়। মহিলার চুল ছোট-ছোট করে ছাঁটা। তাঁর দৃষ্টি ঘরের এক দেওয়ালের একমাত্র জানলাটা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে। মরা মাছের মতো সেই দৃষ্টিতে কোনও বিস্ময় নেই, কোনও আগ্রহ নেই, নেই কোনওরকম জাগতিক ভাবের লক্ষণ। ঊর্ধ্বপানে তাকানো সেই মুখখানি হাঁ হয়ে আছে, স্নায়ুবৈকল্যে তার ঠোঁট বেয়ে মেঝেয় গড়িয়ে নামছে লালা…

shutterstock_166395998

নিজের চেম্বারে ফিরে এসে ফের একবার শৈলীর মুখোমুখি হলেন ডক্টর সান্যাল। শৈলী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘ইনিও কি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন?’’

ডাক্তারবাবু  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘চেয়েছিলেন। এমনকী এখনও চান। গত পঁচিশবছরে এমন একটা দিনও যায়নি, যেদিন উনি নিজেকে শেষ করে দিতে চাননি। কিন্তু মেয়ে পারলেও তার মা পারেননি। একমাত্র মেয়ের সঙ্গে মৃত্যুর ওপারে দেখা করার সাধ ওঁর পূর্ণ হয়নি আজও। এপার আর ওপারের টানাটানির মাঝে পড়ে পাগল হয়ে গিয়েছেন আমার সেই বান্ধবীর মা। গত পঁচিশবছর ধরে এই নার্সিংহোমের ওই ঘরই ওঁর ঠিকানা।’’

একটু সময় আবার দু’জনেই চুপ। শৈলী মুখ নামিয়ে রেখেছে আগের মতোই। দৃষ্টি তার ঘরের মেঝেয়। নৈঃশব্দ ভেঙে ডাক্তারবাবুই বললেন, ‘‘শৈলী, ওই বৃদ্ধার মতোই নিজের শরীরে ন’মাস তোমাকে ঠাঁই দিয়েছিলেন তোমার মা-ও। প্রথম যেদিন তুমি সাড়া দিলে, সেই থেকে আজ অবধি এক মুহূর্তও তোমার কথা না ভেবে কাটাতে পারিনি আমি বা তোমার মা, কেউই। আর শুধু কি আমরা দু’জন? একটা জীবন তৈরি হওয়া কি মুখের কথা, মা? তারপর তিলে-তিলে তাকে নিজের চোখের সামনে বড় হতে দেখা, একটু-একটু করে তাকে হাঁটতে শিখতে দেখা, বলতে-হাসতে-কাঁদতে শোনা, তার আনন্দে আনন্দ পেতে শেখা, তার কষ্টে নিজেও ব্যথা পেতে শেখা… এ কী সোজা কথা মা?’’

শৈলী তখনও চুপ। বুকের খুব ভিতর থেকে একটা দলাপাকানো কান্না ফুলে-ফুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে আবার। বাপিটা যে কী না!

‘‘আমার সেই যে বান্ধবী, সে কোনওদিন জানতেও পারেনি, জীবনটা ঠিক কত বড়। ঠিক কতটা তুচ্ছ তার সামনে এইসব ছোট-ছোট ব্যর্থতাগুলো। তুমি আজ এই পরীক্ষায় অঙ্কে কম পেয়েছ তো কী হয়েছে তাতে? কত ছেলেমেয়ে লেখাপড়ারই সুযোগ পায় না, জানো? কত ছেলে-মেয়ে অঙ্কের ম্যাজিক চোখে দেখতেই পায়নি কোনওদিন? কত মানুষ চোখে দেখতেই পায় না, কোনওদিন তারা জানতেও পারল না সূর্যাস্তের অপরূপ কাঁচাসোনা রং, দেখতেই পেল না ঘাসের ডগায় ভোরের শিশিরের চোখধাঁধানো ঝলকানি… কত বন্ধু-বান্ধব তোমার, তোমার স্যার-ম্যাডামরা, এখনও অপেক্ষায় থাকা তোমার ভবিষ্যতের কত-কত সুন্দর মুহূর্তরা…’’

শৈলী আর নিজেকে আটকাতে পারল না। ছুটে এসে বাপিকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। বাপির এই চেম্বারটা খুব ঠান্ডা। শীত করছিল তার অনেকক্ষণ থেকেই। কিন্তু এখন আর করছে না। কী সুন্দর গরম বাপির গা-টা। কী ভীষণ শান্তি এইখানটায়…

এই শান্তি ছেড়ে কেউ স্বেচ্ছায় দূরে যায়? যেতে পারে?

8

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s