সনাতনের ছেলে (৩১.০৫.২০১৭)

india-bike-FAIRYTALE1215

রোজ যখন সনাতন বাড়ি থেকে বেরয়, সেসময় নেহাত নিশাচর না হলে কোনও প্রাণীর জেগে থাকার কথা নয়। অন্ধকারের আড়ালে সারা রাত চুপিচুপি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেড়ে পৃথিবীর বাতাসের ভার বাড়িয়েছে যে গাছপালারা, তারা ওইসময় ভোরের পদধ্বনি শুনতে পেয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে। চটপট! চটপট! পোশাক পালটে অক্সিজেন তৈরির কাজে নেমে পড়তে হবে তাদের!

মূক, বধির এবং বুদ্ধিহীন গাছপালারা জানেও না, দিনে তাদের এক রূপ আর রাতে যে বিলকুল অন্য— এ সত্য কৌতূহলী মানুষ জেনে ফেলেছে অনেককাল আগেই। ব্যস্তসমস্ত হয়ে পোশাক পালটাতে-পালটাতে সেইসব মূঢ়মতি গাছেরা দ্যাখে, সনাতন সকাল-সকাল কুলকুচো সেরে, এক কাপ চায়ে গলা ভিজিয়ে বেরিয়ে পড়ছে নিজের সাইকেল নিয়ে। বাড়ি থেকে অনেক-অনেক দূরে, শহরের শেষ প্রান্তে, কাঠ কাটার এক মিলে রোজ সারাদিন ঘাম ঝরায় সনাতন। বাড়ি থেকে সে-অবধি সাইকেলে যেতে সময় লেগে যায় একঘণ্টা মতো। একটু সকাল-সকাল গিয়ে পৌঁছতে পারলে তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফেরা যায় সন্ধের আগেই। সেকারণেই এত ভোর-ভোর বেরনো তার।

টাকাপয়সার দিক থেকে খুব যে খারাপ অবস্থা সনাতনের, তেমনটা নয়। মাস গেলে যে টাকাটুকু পায় সনাতন, তাতে বাড়িতে তাদের তিনটি প্রাণীর চলে যায় একরকম। তা বলে খুব ভাল যে অবস্থা, তেমনটাও নয়। ছেলেটা এবছর মাধ্যমিক দিয়েছে। তাকে যে তিনটের বেশি টিউশানে দিতে পারেনি সনাতন, সে তো তার সামর্থ্যে কুলোয়নি বলেই। সনাতনের মনে আছে, দু’বছর আগের এক লোডশে়ডিংয়ের রাতে ছেলেকে বাড়ির ছাতে ডেকে নিয়ে গিয়ে আমতা-আমতা করে সে জানিয়েছিল, টিউশানি বাবদ মাসে আটশো টাকার বেশি সে কিছুতেই দিতে পারবে না। ছেলে অবশ্য তাতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়নি বিশেষ। বরং সনাতনের বরাবরের শান্ত স্বভাবের ছেলে সঞ্জয় ঘাড় নেড়ে জানিয়েছিল, স্কুলের পড়ার বাইরে তিনখানা টিউশানিই তার জন্য যথেষ্ট।

a-father-teaches-his-son-to-ride-a-bike-without-training-wheels

সনাতন নিজে ক্লাস এইট অবধি লেখাপড়া করার পর আর করতে পারেনি। গরিব ঘরের চেনা স্ক্রিপ্ট মেনে তার বাবা মারা গিয়েছিলেন হঠাৎই। মা আর বয়স্থা বোনের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে সনাতনকে লেখাপড়া মুলতুবি রেখে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল কাজের খোঁজে। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তাই সনাতনের অনেক স্বপ্ন। নিজে লেখাপড়া করতে পারেনি বলে তার যত আফসোস, সবটুকু পুষিয়ে দেবে এই ছেলেই, ঠিক জানে সনাতন।

কিন্তু বাস্তব জীবন তো আর সবসময় মানুষের মনের মতো চিত্রনাট্য মেনে চলে না। কার্যক্ষেত্রে তাই দেখা গিয়েছে, সনাতনের একমাত্র ছেলে সঞ্জয় লেখাপড়ায় ঠিক ততটাও চৌখস নয়। খুব যে খারাপ রেজ়াল্ট তার, তেমনটা অবশ্য নয়। সারাবছর ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে টেনেটুনে পাশ করার মতো ছেলে সে নয় ঠিকই। তা বলে খুব যে মেধাবী ছাত্র সে, তেমনটাও নয়। ওই… গড়পড়তা ছেলের গড়পড়তা রেজ়াল্ট বছর-বছর আর কী!

সনাতন সেকথা জানে। এবছর তার ছেলেটা মাধ্যমিক দিয়েছে। সনাতন ভালই জানে, তার ছেলে মেধা তালিকায় প্রথম একশোর মধ্যে থাকবে না নিশ্চয়ই। তা বলে একেবারে শেষ একশোতে যে ঢুকে বসে থাকবে, তেমনটাও নয়। আগের অনেক-অনেকবারের মতোই এবারেও মোটামুটি একটা রেজ়াল্টই করবে সে। আর আগের অনেক-অনেকবারের মতোই ছেলেকে বকাঝকা করতে পারবে না সে এবারেও। কী করে করবে?

123463-123

লেখাপড়া করে না বলে যে রেজ়াল্টও মোটামুটি হয় সঞ্জয়ের, তা তো নয় একেবারেই। ছেলেটা খাটে। রাত জেগে-জেগে লেখাপড়াও করে। তবু কোথাও গিয়ে যেন একটা খামতি থেকে যায়। টিউশানি আরও কয়েকটা দিতে পারলে ঘাটতিটুকু মিটে যেত কি? বারবার মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কেটে ওঠা প্রশ্নটার উত্তরের অভাবকে দীর্ঘশ্বাস দিয়ে চেপে দিতে শিখেছে সনাতন অনেকদিন আগে থেকেই।

আজ ছেলের মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরনোর কথা। সকালে কাঠ মিলে কাজে আসার পথে মনস্কামনা মন্দিরে দশটাকার পেঁড়া চড়িয়ে এসেছে সে। তাতে যে তার ছেলে একেবারে একশো-দুশো নাম্বার বেশি পেয়ে যাবে না, ভালই জানে সনাতন। তবু আজকাল এক-দু’নাম্বারের জন্যও ধুন্ধুমার হয় বড় স্কুল-কলেজে ভর্তির সময়, সেকথাও শুনেছে সনাতন। না শুনে উপায় কী। ছেলের লেখাপড়া নিয়ে বাপের উচ্চাশা যে মরেও মরতে চায় না কিছুতেই।

সন্ধেবেলা ক্লান্ত শরীরে সাইকেল ঠেলে বাড়ির দিকে ফিরছিল সনাতন। সকাল এগারোটা নাগাদই তার রং-ওঠা পুরনো মোবাইলটায় ফোন করে খবর দিয়েছিল ছেলে। ৬৫% পেয়েছে সে। তাদের স্কুলে হায়েস্ট উঠেছে ৯৭%-এর কাছাকাছি। ছেলের রেজাল্টে খুব যে দুঃখ পেয়েছে সনাতন, তা নয়। তা বলে ভীষণ যে খুশি হতে পেরেছে, তেমনটাও নয়। শহরের ঠিক মধ্যিখানে তাদের বাড়ির পাশেই সুকুমার ডাক্তারের বাড়ি। ডাক্তারবাবুর মেয়েটিও সনাতনের ছেলের বয়সি। সঞ্জয়ের মুখ থেকেই ফোনে শুনেছে সনাতন, মেয়েটি তাদের গার্লস স্কুলে ৯৫.৫% পেয়ে প্রথম হয়েছে। টিভিতে নাকি সেই মেয়ে বলছিল, আট জায়গায় টিউশানি পড়ত সে। সাইকেলের প্যাডেল ঠেলতে-ঠেলতে ক্লান্ত দেহ আর মনের ষড়যন্ত্রে সনাতনের মনে খচখচ করছিল সেকথাটাই, নিজের ছেলেটাকে সে আর ক’টা টিউশানি বেশি দিতে পারল না বলেই কি…

এইসব ভাবতে-ভাবতেই বাড়ি ঢোকে সনাতন। বউয়ের সঙ্গে বসে মুড়ি চানাচুর খেতে-খেতে শোনে, সারাটাদিন নাকি সাংবাদিকদের ভিড় আর টিভি ক্যামেরার দাপটে পাশের বাড়িতে কাক-চিল বসতে পারেনি। সে ঠিক আছে, কিন্তু তাদের ছেলে কই? সনাতনের বউ বলে, ছেলে বিকেল থেকেই ছাতে উঠে বসে আছে। মন খারাপ হওয়ার কথা নয়, তবুও…. আসলে ছেলের আদৌ মন খারাপ হয়েছে কিনা, তা তো জানার উপায় নেই। ছোট থেকেই বড় মুখচোরা ধরনের ছেলে কিনা। সনাতন সব শুনে ছেলের সঙ্গে কথা বলবে বলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। ছাতে ওঠার আগেই অবশ্য ছাতের দরজার পাশের অন্ধকারে থমকে যেতে হয় তাকে। ছাতে দাঁড়িয়ে ও কার সঙ্গে কথা বলছে তার মুখচোরা ছেলে?

-“সন্দীপনের চেয়ে কম পেয়েছিস বলে কাকু-কাকিমার মন খারাপ? তুই ঠিক জানিস?”

পাশের বাড়ির দোতলার জানালা থেকে ওবাড়ির মেয়েটার রিনরিনে গলা শোনা যায়, “মুখে কিছু না বললেও আমি জানি রে, বাপি মাম্মি দু’জনেই খুব আশা করেছিল আমি সারা জেলাতে ফার্স্ট হবই। আমার খুব খারাপ লাগছে রে সঞ্জু। সারাজীবনে একদিনে এত নাটক আমাকে কোনওদিন করতে হয়নি, যতটা আজ ওই ক্যামেরাগুলোর সামনে করতে হয়েছে। কিন্তু আমি কী করব বল সঞ্জু? কী করব আমি? আমি তো ওদের মুখে হাসি ফোটাতেই চেয়েছিলাম। অঙ্কে যে কোথায় দু’নাম্বার কাটল, আমি–”

“হাতের কাছে পেলে একটা গাঁট্টা মারতাম তোর মাথায়! বোকা মেয়ে! তোর মতো নাম্বার পেলে আজ আমি তোর সঙ্গে কথাও বলতাম না পাগল! ৯৫.৫% ক’জন পেয়েছে বল তো এই শহরে? আমাকে দ্যাখ, আমার বাবা কত ছোট একটা কাজ করে, জানিস তো। তবু লোকটা আমাকে যতটা পেরেছে পড়িয়েছে। তবুও দ্যাখ আমি লোকটার আশা পূরণ করতে পারিনি। মাত্র ৬৫%! তিন-তিনখানা টিউশান দেওয়ার পরেও… জানিস রিয়া, এই ছাতে দাঁড়িয়ে এরকমই একটা সন্ধেয় যেদিন বাবা আমাকে বলেছিল টিউশানির জন্য আটশোর বেশি টাকা দিতে পারবে না, আমিও চোয়ালে চোয়াল ঘষে ঠিক করেছিলাম, এই সামান্য সম্বল নিয়েই অন্তত ৮০% পেয়ে দেখাব। কিন্তু সেটুকুও পারিনি।”

veerni-10_custom-fec1ba5de1f50d7c6f25aa7121689782a184cc44-s900-c85

কিছুক্ষণ ছাতটা নিস্তব্ধতা মেখে পড়ে থাকে চুপচাপ। তারপর সনাতনের ছেলেই আবার বলতে থাকে, “বাবা-মায়েরা তো আশা করবেনই রিয়া। সব বাবা-মায়ের চোখেই তার নিজের সন্তানই এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান হয়। সেই ভাবনাটাকে সত্যি করতে আমরা ছেলে-মেয়েরা নিষ্ঠাভরে চেষ্টাটুকু করতে পারি। তার বেশি যে আমাদের হাতে কিছু নেই, সেকথা ওরা কি আর জানে না পাগল? তোর বাবা-মা কি আজ ভালবেসে বুকে জড়িয়ে ধরেনি তোকে? এই তো দ্যাখ না, আমার বাপেরও আজ একটু-একটু মন খারাপ হয়েছে, আমি জানি। তবুও একটু আগে সে যখন সারাদিন খেটেখুটে ভাঙাচোরা শরীর আর মনটা নিয়ে বাড়ি ফিরল, সাইকেলের হ্যান্ডেলে প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগে ঠিক সে নিয়ে এসেছে আমার পছন্দের দোকানের মিষ্টি। বাপ-মায়েরা দুঃখ পেলেও রোজ দিনের শুরু আর শেষে তো আমাদের ভাল না বেসে পারবেন না রিয়া। তাই না? কী রে? শুনছিস তুই? ঘরে লাইটটা জ্বালাবি না এখনও?”

সন্ধের অন্ধকারে ভিজে চুপচুপ সনাতন চোখ মুছে নিঃশব্দে নীচের তলার দিকে পা বাড়ায়। অপদার্থ সে একটা। সে নিজে যা পারেনি, ছেলে সেই মাধ্যমিক পাশ করেছে, এই আনন্দে ছেলের জন্য সে বাড়ি ফেরার সময় জিলিপি কিনেছে, এদিকে তার প্যাকেটটা রয়ে গেছে উঠোনে সাইকেলের হ্যান্ডেলেই!

Awadhi_jalebi

 

নিজেকে এই বোকামির জন্য কত মার্কস দেবে সনাতন? ৬৫%? নাকি তার ছেলে আজ সত্যিই ছাপিয়ে গিয়েছে তাকে? মাত্র ১০০% দিয়ে এমন ছেলেকে মাপতে পারা সম্ভব? কোনওদিন পারবে কি কেউ?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s