অঙ্ক জ়ানতি হয় (১৫.৬.২০১৭)

“শালা, নপুংসক!”

ওই একটা বিশেষনই কাল হয়েছিল আমার। বা হয়তো ভালই হয়েছিল। এতদিন পরও বুঝতে পারি না, নিজের সম্পর্কে নিজের ডান হাত আর বাম হাতের মুখে একসঙ্গে ওই চোখা বিশেষণখানা শুনে যে কাণ্ডটা ঘটিয়েছিলাম, সেটায় আখেরে আমার লাভ হয়েছিল না লোকসান। কিন্তু কিছু একটা হয়েছিল, সেকথা নিয্যস সত্য। সত্যি বলতে কী, একটা কিছু নয়, বরং অনেক কিছুই হয়েছিল তারপর। জিন্দেগিতে সেই প্রথম আট-ন’ পাতার একখানা প্রেমপত্র যে লিখে ফেলেছিলাম, তার পিছনে ইন্ধন জুগিয়েছিল তো ওই গালাগালিটাই।

।।১।।

DSCN1193._1920pJPGতখন পড়ি ক্লাস এইটে। রামকৃষ্ণ মিশনের জাঁদরেল স্কুল। সেই স্কুলে রোজ সকালে ১০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে এই শ্লোক, ওই মন্ত্র, সেই প্রার্থনা আউড়ে, চিত্ত শুদ্ধ করে তবে দিন শুরু। ‘সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্বশাসিত বিদ্যালয়’, যেখানে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী মহারাজদের কথাতেই সূর্য ওঠে, বসে, নামে… প্রায়শই হেডমাস্টার মহারাজের মাথাতেও ঢুকে পড়ে। গেরুয়া বসনে মোড়া হেডমাস্টার মহারাজকে করিডরে দেখতে পেলেই তাই ছাত্ররা হেলেন কেলারের চরিত্রে ঢুকে পড়ে নিমেষে! এ তখনকার কথা, যখন লঘু পাপেও ছাত্রদের গুরুতর পিটিয়ে পাটপাট করে বাড়ি পাঠাতে শিক্ষকরা দু’বার ভাবতেন না। বাড়ি ফিরে “স্যার মেরেছেন!” বললে বাবার বেল্ট প্যান্ট থেকে লাফিয়ে নেমে নাচতে-নাচতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত আমাদের পিঠে। উপরন্তু মিশনের স্কুলে ছিল আরও হাজারও আইন-কানুন, শাসন-শোষণ। চুল স্বাভাবিকের তুলনায় একটুখানি বড় হলে গার্জিয়ান কল, পরীক্ষায় বিশের জায়গায় উনিশ পেলে গার্জিয়ান কল, ক্লাসে বই আনতে ভুলে গেলে গার্জিয়ান কল! তবে বজ্র যেখানে যত আঁটুনি হয়, ফস্কা গেরোও হয় সেই অনুপাতেই। এত কড়াকড়ির ফলে আমাদের আত্মিক বিকাশ যতই হোক, বয়ঃসন্ধি কিন্তু এসেছিল নিজের নিয়মেই। এসেছিল চাবুক-বেতের রেয়াত না করেই। তাকে উস্কে দিতে আমাদের পবিত্র রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের পাশেই ছিল তথাকথিত ‘অপবিত্র’ মেয়েদের স্কুল। রেজ়াল্টের ব্যাপারে রেষারেষি তো ছিলই, ডিসিপ্লিন আর ব্রহ্মচর্যেও আমাদের অনেক এগিয়ে থাকতে হবে ওদের চেয়ে, এই ছিল স্কুলের শিক্ষকদের মতামত। এখন মনে হয়, ভাগ্যিস ওঁরা ব্যাপারটাকে অ্যায়সা নিষিদ্ধ মার্কা করে রেখেছিলেন! তাতেই তো আমাদের আকর্ষণটা আরও বেড়েছিল! ফাইভ-সিক্সে পড়তেই পেকে লাল আমরা, ছোটরা, স্কুল ছুটির পর বাধা রিকশায় বাড়ি ফেরার সময় দেখতাম, সেভেন-এইটের দাদারা ছুটির পর সাইকেল নিয়ে সেই প্রতিবেশী স্কুলের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে কায়দাবাজি মেরে বাড়ি ফিরছে। এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল আর অন্য হাতে জীবন নিয়ে সেই রাস্তায় ছেলেদের স্টান্ট দেখলে আদিত্য চোপড়া কবেই ধুম সিরিজ়ের জন্য আমাদের স্কুলের ছেলেদের সাইন করিয়ে রাখতেন!

 

।।২।।

স্কুলের কথা অনেক হল। এবার নিজের কথা বলি। আমাদের ব্যাচে সেসময় শহরের সবচেয়ে নামজাদা মেয়েটির নাম ছিল নেহা। শহরের বুকে ছিল ওর বাবার নার্সিংহোম। আমাদের ছোট শহরে ছোট-ছোট একতলা-দু’তলা বাড়ির পাশে শহরের ঠিক মধ্যিখানে ওদের বাড়িটা ছিল এক অট্টালিকা। অসম্ভব সুন্দরী না হলেও নেহার মধ্যে সব মিলিয়ে একটা কোনও রহস্যময় ব্যাপার নিঘঘাত ছিল। যার প্রভাবে আমাদের ব্যাচের কম-বেশি প্রায় সকলেই নেহার স্রেফ নামটুকু শুনলেই ভাবে বিভোর হয়ে যেত। যেন রামকৃষ্ণদেবের সামনে কেউ মা কালীর নাম নিয়েছে! আমি কোনও শাহরুখ খান ছিলাম না মোটেই, যে খেলতে নামার আগেই কোনও গৌরী খানকে জুটিয়ে বসে থাকব। অন্যদিকে ‘নেহার জন্য প্রেম’ ব্যাপারটা ছিল একটা ইয়াব্বড় বিশাল পিছল গর্ত। আরও অনেকের মতোই লাইন দিয়ে আমিও যে তাতে অচিরেই পপাৎ চ হব, তাতে আর কেউ আশ্চর্য হলেও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা অবাক হয়নি মোটেই। ‘প্রেম’ বা ‘লাভ’ ব্যাপারটা যে কী, সে কথা আমাকে প্রথমবার বুঝিয়ে বলেছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড প্রণব। তখন আমরা ক্লাস ফোর। কনসেপ্টটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই কো-এড প্রাইমারি স্কুলে সহপাঠী মেয়েদের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আমি আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম নেহাকে। সেই ব্রাহ্মমুহূর্তেই মনে-মনে নেহার গলে মালা দিয়েছে যে মূঢ়মতি, রামকৃষ্ণ মিশনের ডিসিপ্লিনের সাধ্য কী, তলে-তলে তার মনে কী চলছে খুঁজে বের করা! হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরও অহোরাত্র আমার মনে তাই নেহার চিন্তা। পড়াশোনায় তা বলে খারাপ ছিলাম না মোটেই। সেই সময়টাই ছিল মারামারির সময়। আমি ভর্তি হলাম রামকৃষ্ণ মিশনে, নেহা গেল পাশের স্কুল বার্লো বালিকায়। মনের কথা নেহাকে বলতে না পারি, ডায়রিতে লিখে রাখব ভেবে একটা পুঁচকে ডায়রিতে তদ্দিনে জোটানো ইংরেজি জ্ঞান কুড়িয়ে-বাড়িয়ে এক করে মরিয়া হয়ে লিখে ফেললাম, “আই অলমোস্ট লাভ নেহা!” মাথার মধ্যে ভাবনা, ‘মোস্ট’ মানে সবচেয়ে বেশি, তা হলে ‘অলমোস্ট’ মানে বুঝি তার চেয়েও বেশি। বাবার হাতে সে লেখা পড়ার পর বাড়ির স্কেলগুলো দিয়ে ‘অলমোস্ট’ মার খেয়েছিলাম ‘অতিরিক্ত ডেঁপোমি’র অপরাধে! কিন্তু দেশ-বিদেশের কাঁটাতারের বর্ডারেও যে প্রেম আটকায় না, তাকে সামান্য স্কেল আর কী আটকাবে? প্রেম কমার বদলে উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। কমপিটিটিভ সেই দুনিয়ায় ক্লাস ফোর থেকেই আমরা সবাই টিউশন পড়তাম। সেই সময়ে হাই স্কুলে ভর্তি হতে হলে হাড্ডাহাড্ডি অ্যাডমিশন টেস্টে বসতে হত। এখনকার মতো পাশ-ফেলহীন জীবন, লটারি মেনে স্কুলে ভর্তি, এসব তখন ছিল না। স্কুল আলাদা হয়ে গেলেও টিউশানিতে নেহাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে কে? একতরফা প্রেমের পারদ তাই চড়তেই থাকল। উত্তেজিত হয়ে কোনও-কোনও রাতে স্বপ্নের ঘোরে নেহার মুখে দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে ওকে দ্রোণাচার্য আর নিজেকে একলব্য ভেবে নিয়ে ওর পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসেও পড়লাম! ওকে নিয়ে আকাশ-কুসুম কল্পনার মাঝে ভিলেন হয়ে মাঝে-মাঝেই ব্যাগড়া দিত ওর বাবার সোশাল স্ট্যাচারের চিন্তা-ভাবনা। নিজের কাছে নিজেরই প্রশ্ন ভেসে আসত, “চাঁদে আর বাঁদরের ইসে, কোনওদিনও মিল হয় হতভাগা?” কিন্তু বয়স তখন রক্ত গরম হওয়ারও আগের স্টেজে! সবে তৈরি হচ্ছে, টগবগ করে ফুটতে-ফুটতে বাড়ছে শরীর। টম অ্যান্ড জেরির শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সাদা জেরি আর শয়তান লাল জেরির মতোই আমারও মাথার দু’পাশে ছোট্ট ডানা নিয়ে উড়ে বেড়াত দুটো আমি। একজন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমাকে মানুষ করতে চাইলেই অন্যজন ধমকে বলে উঠত, ‘ঘাবড়াও মত! লড় কে লেঙ্গে পাকি… থুড়ি, নেহা জান!’

 

।।৩।।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে, এই অ্যাতো প্রেম, অ্যাতো প্ল্যানিং, ক্লাস সেভেনে বসেই বিয়ের এক্সট্রা-পাকা চিন্তা, সবই ছিল এক তরফা। দাড়ি বেরনোরও আগে তখন আমাদের মনে প্রেমের পোকা বেরিয়েছে! টিউশানিতে নোট্স দেওয়া-নেওয়া বাদে নেহার সঙ্গে আমার বাক্যালাপটুকু ছিল না। যেটুকু যা দেখা হওয়া, ওই টিউশানিতেই। এইখানে একটা গুরুতর তথ্য জানাই, নেহার জন্য আমাদের ছোট শহরের বড়-বড় পাগলদের মধ্যে আমার বাল্যবন্ধু প্রণবও ছিল একজন! তাই নিয়ে আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে মিনিমাম মনোমালিন্যটুকুও হয়নি কোনওদিন। বরং ‘দেখা যাক, কে পায়!’ টাইপ একটা ফ্রেন্ডলি রেষারেষি ছিল। পত্নী হিসেবে না পেলেও যদি বন্ধুপত্নী হিসেবেই কাছে পাই, কথা বলার সুযোগ পাই, এইসব ভুলভাল ভাবতাম আমরা। তখন মোবাইল ফোন জন্মায়ইনি। ফোন বলতে বাড়িতে-বাড়িতে ল্যান্ডফোন। নেহার সঙ্গে কথা বলতে গেলে বাড়ির ল্যান্ডফোনে ফোন করতে হয়। নাম্বার পাব কোথায়? আইডিয়া! নেহার বাড়িটা আসলে একটা নার্সিংহোম। শহরের টেলিফোন ডিরেক্টরিতে সে বাড়ির ফোন নাম্বার খুঁজে পাওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। কোনও একসময় হয়তো বাবা বাইরের ঘরে টিউশানি পড়াচ্ছেন, মা গিয়েছে বাজারে, দাদা গিয়েছে টিউশানে, সেই সুযোগে দুরুদুরু বুকে ল্যান্ড ফোনের রিসিভার তুলে ফোন নাম্বার ডায়াল করলাম। তখন বোধহয় ক্লাস সেভেন-টেভেন হবে। নার্সিংহোমের রিসেপশনিস্টকে কাঁপা গলাতেও স্মার্টলি বলে ফেললুম, “নেহার বন্ধু। ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই, ওদের ঘরের নাম্বারটায় ফরওয়ার্ড করে দেবেন কলটা, প্লিজ়?” সঙ্গে-সঙ্গে এক মিনিটের রিং-রিং, ওপাশ থেকে একটা ‘হ্যালো’! সে ‘হ্যালো’ পুরুষকণ্ঠের না নারীর, সে অবধি শোনার আর সাহস হয়নি! তার আগেই ভয়ে রিসিভার নামিয়ে রেখেছি। দমাস করে ফোনটা রাখার আগে ওপাশের মানুষটা সেদিন আমার হৃদযন্ত্রের ধড়াদ্ধড় আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন নির্ঘাত!

 

।।৪।।

barlow

এই করতে-করতে সেভেনের শেষের দিকে প্রণবকে ঠেলেঠুলে উস্কে রাজি করালাম নেহাকে প্রোপোজ় করার জন্য। আমার জন্য নয়, ওর নিজের জন্যই। মনে-মনে ইচ্ছে, প্রণব ফ্লপটা খাক, তারপর আমার রাস্তা ক্লিয়ার। প্রণবের বাবাও শহরের একজন নামী-দামি প্রোমোটার, সেই সূত্রে নেহা আর প্রণবের বাবার আলাপ আছে। সেই আলাপের ভরসাতেই প্রণব মাঝে-মাঝে নেহার বাড়িতে ফোন করে, স্কুল ছুটির পর পাঁচ-দশ মিনিটের জন্য দেখাও করে নেহার সঙ্গে। বোকা-বোকা কথা বলে, ফুচকা খায়, তারপর যে যার বাড়ি ফিরে যায়। প্রণবের পাশে আমিও থাকি, বাঁয়ার পাশে তবলার মতো। কিন্তু ফাটা তবলা। মুখ বুজে চুপ করে লক্ষ করি হাসির দমকে নেহার ভুরুর ওঠা-নামা, হাত দিয়ে ক্ষণে-ক্ষণে অবাধ্য চুলগুলোকে কানের পিছনে গুঁজে দেওয়া, অমন বিশাল রাজপ্রাসাদের রাজকন্যের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া… সে যাই হোক, গ্যাস খেয়ে গিয়ে প্রণব শেষমেশ একদিন ছুটির পর নেহাকে বলেই ফেলল ছোট মুখে বড় কথা। আর সেদিন রাতেই শহর জুড়ে বন্ধুমহলে জানাজানি হয়ে গেল, প্রণবের প্রস্তাব শুনে নেহা ওকে জীবন থেকেই ছেঁটে ফ্যালার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ, ওদের বন্ধুত্বটাও আর রইল না। প্রণব দেখলাম বিন্দাস। বলল, “দোর! বাঁচা গিয়েছে। শালা, লাইফে কি আর অন্য মেয়ে নেই নাকি?”

 

।।৫।।

তারপর ছোট শহরের ঘরে-ঘরে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, এরপর আমার প্রোপোজ়ালের পালা। দেখতে-দেখতে বছর ঘুরে গেল। নেহার বাড়িতে আরও শ’খানেকবার ফোন করে ফেলেছি এর মধ্যে। বলতে পারিনি কিছুই। স্রেফ জ্বালা বেড়েছে। বোরোলিন, লাল ওষুধ, বার্নল, কারওরই সাধ্য কী, সেই জ্বালা জুড়োয়? শেষমেশ ছিয়াত্তর বছরে হ্যালির ধূমকেতুর একবার মাত্র উদয়ের মতোই মাহেন্দ্র এক ক্ষণ আবির্ভূত হল আমার জীবনে! নেহার কিছু নোট্‌সের প্রয়োজন ছিল। উপায়ান্তর না পেয়ে সে বেচারি আমাকে বাড়িতেই ডেকে ফেলল। টিউশানি ব্যাচ থেকে নেহার প্রস্তাবটা বুকে আগলে সাইকেল চালিয়ে ঊধ্বর্শাসে বাড়ি ফিরেই প্রণবকে ফোন করলাম, “পানু রে, নেহা কাল বাড়িতে ডেকেছে আমাকে!”

“গুল মারার আর জায়গা পাসনি?”

“গুল না রে, মাক্কালী বলছি! কাল বিকেলে! প্রবীর স্যারের নোট্‌স নেবে বলে বাড়ি ডাকল! যাব?”

“আতাক্যালানে, নাকি? যাবি না মানেটা কী?”

“না, মানে… বড্ড ভয় করছে রে! হাত-পা সব পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাবে মনে হচ্ছে!”

“শালা! ওর বাড়িতে ওইসময় কেউ থাকবে কিনা খোঁজ নিয়েছিস?”

“ধুর! সে আবার জিজ্ঞেস করা যায় নাকি? কিন্তু আমার মন কী বলছে, জানিস? মন বলছে, ওইসময় ওর বাড়িতে নিশ্চয়ই কেউ থাকবে না! সেইজন্যই তো বাড়িতে ডেকেছে!”

“থাক! তোর কোন বডি পার্ট নেহার বাড়ি যাওয়ার কথা ভেবে আর কী-কী বলছে, সেসব ডিটেল্‌স না বললেও চলবে! কাল স্কুলে আয় শালা। সুতীর্থকে জানিয়ে দিচ্ছি আমি!”

 

পরদিন স্কুলে যাওয়ার পর পিরিয়ডের ফাঁকে-ফাঁকে সুতীর্থ আর প্রণব মিলে সেই কাজটা করল, যেটা ‘চক দে ইন্ডিয়া’য় শাহরুখ খান হকি খেলোয়াড় মেয়েগুলোর সঙ্গে করেছিল। উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে-ফুটতে বিকেলে স্কুলফেরতা আমি নেহার বাড়ি গেলাম, ওর বাড়ির কাজের মেয়ে দরজা খুলল, নেহা এগিয়ে এসে নোট্সগুলো নিয়ে ‘থ্যাঙ্ক ইউ রে!’ বলে মিষ্টি হেসে ঘরের ভেতর চলে গেল। কেউ বসতে বলবে কী, সারা বাড়ি জুড়ে কাউকে দেখতেও পেলাম না! “আরে থ্যাঙ্ক ইউ কীসের? স্বামী, মানে ইয়ে, বন্ধু হিসেবে এটা তো আমার কর্তব্য! ওকে, টাটা!” বলে চুপচাপ আমি বেরিয়ে এলাম। তারপর পরদিন স্কুলে যেতেই সুতীর্থ আর প্রণবের সাঁড়াশি চাপে এক-এক করে আমার সবটা খুলে বলা অ্যান্ড সেই শুনেই দু’জনের ওই উক্তি,

“শালা, নপুংসক!”

 

।।৬।।

প্রেম আর রাগ, দুটোর যে কোনও একটাই মানুষকে অন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমার একসঙ্গে দুটো হয়েছিল। একদিকে প্রেমে থইথই করছি, অন্যদিকে পানু আর সতুর কথা শুনে ব্রহ্মতালু থেকে পায়ের তালু, সমস্তটা জ্বলে গিয়েছে! সেই একদিনে কাটা ঘায়ে বস্তা-বস্তা আয়োডাইজ়ড নমক ঢেলেছে ওরা। মাথায় চেপে গেল খুন! সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে খাতার ভাঁজে রেখে লুকিয়ে-লুকিয়ে লিখে ফেললাম আট-ন’পাতার একখানা সুদীর্ঘ প্রেমপত্র! সেই কবে কোনকাল থেকে ওকে ভালবেসেছি, কবে স্কুলফেরতা ওকে দেখতে-দেখতে সাইকেল সমেত পড়ে গিয়েছি হাইড্রেনে, কতদিন ওর অজান্তেই ওর রিকশার পিছুপিছু চলে গিয়েছি ওদের বাড়ির দরজা অবধি, কত রাত আমার ইনসমনিয়ার কারণ হয়েছে ও, একদিন খুব বড় মানুষ হয়ে ওর বাবার সামনে যাওয়ার আমার স্বপ্ন, আমাদের ছেলে-মেয়ে হলে তাদের নাম কী রাখা যায়, সব! সব লিখে ফেলেছিলাম ওই আট-ন’টা লম্বা-লম্বা পাতায়। হাতের লেখা যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে, আটমোস্ট যত্নের সঙ্গে লেখা আমার সেই চিঠিতে আরও ছিল, আমি নিজে ওর জায়গায় থাকলে কেন বয়ফ্রেন্ড হিসেবে আমাকেই বেছে নিতাম, তার সপক্ষে বেশ কিছু পয়েন্ট! গাণিতিক হিসেবে আমার প্রোপোজ়ালের উত্তরে নেহার আমাকে ‘হ্যাঁ’ বলার চান্স কতটা, কতটাই বা আশঙ্কা ‘না’ বলে দেওয়ার, পার্সেন্টেজে তার সমস্তটা হিসেব করে জানিয়েছিলাম চিঠিতেই। কায়দা মেরে চিঠির উত্তর চেয়েছিলাম এক মাস পর আমার জন্মদিনের দিন। হুঁ হুঁ বাওয়া… সেখানেও পলিটিক্স! ভাবলাম, জন্মদিনের দিন কি আর চড়-জুতো মারবে অমন নরম মেয়েটা? মন রাখতে হ্যাঁ-ই বলে দেবে ঠিক! বোঝো কাণ্ড! ক্লাস এইটেই যে পড়তাম তখন, বিশ্বাস হচ্ছে তো এতক্ষণে? নপুংসক আমাকে মেরে ফেলে বীরপুরুষ আমি নেক্সট দিনই টিউশান ছুটির পর নেহার রাস্তা আটকে ওর হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে শাহরুখ খান মার্কা হাসি হাসার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে বললাম, “হাহ! পরে পড়িস এটা!” নেহা নির্বিকার মুখে চিঠি ব্যাগে পুরে এগিয়ে গেল। আমিও বাড়ি ফিরে এসে ফোন করলাম সেই দুই মহাপুরুষকে, যারা ২৪ ঘণ্টা আগেই আমার পুরুষত্বের খিল্লি উড়িয়েছিল!

 

।।৭।।

হিসেব-নিকেশ করে দেখে নিয়েছিলাম, সামনের মাসে আমার জন্মদিনের দিনও আমাদের টিউশানির ডেট পড়বে। অর্থাৎ নেহার সঙ্গে আমার দেখা হবে। নোট দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে মাঝের এই এক মাস নেহা এক্কেবারে স্বাভাবিক ব্যবহার করেছে। আর আমি খুঁজে মরেছি, ‘ও কি একটু বেশি লজ্জা পাচ্ছে আমার সঙ্গে কথা বলতে? অমুক কথাটা বলার সময় কি অকারণে ওর ডান ভুরুটা কেঁপে উঠল একটু বেশিই? চিঠির উত্তরটা কি ও দিয়েই ফেলেছে, নাকি এখনও ভাবছে?’ মনের মধ্যে উথাল-পাথাল ঝড়, অসহ্য সাসপেন্স। এক মাসে কত যে ভিখিরিকে এক টাকা করে দান করেছি, ইয়ত্তা নেই! টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে সেই দান-ধ্যানের মর্ম তুম কিয়া জানো রমেশবাবু? বাইরে বেরোলেই রাস্তার দু’পাশের সমস্ত মন্দিরে মনোবাসনা জানাতে-জানাতে যেতাম। মনে-মনে প্রার্থনা, ‘এই একটা মেয়ে পাইয়ে দাও ঠাকুর। সারা বছর জনসমক্ষে যতই তোমাকে ছি-ছি করি না কেন, মনে-মনে যে তোমাকেই বস বলে মানি, সে কথা আর কেউ না জানলেও তুমি তো জানো! প্লিজ় প্লিজ় প্লিজ়!’

2499536

এক মাস সে কী ভয়ঙ্কর টানাপোড়েন! দিবানিশি উঠতে-বসতে নেহার ধ্যানে কোথা দিয়ে দিনগুলো পেরিয়ে গেল, বুঝতেও পারলাম না। এই করতে-করতেই জন্মদিন চলে এল। সক্কালবেলা টিউশান। সেদিন ওই দু’ঘণ্টা স্যার যে কী সাপ-ব্যাং পড়ালেন, স্যারই জানেন! আমার মাথায়, বলাই বাহুল্য, স্যারের পড়ানো সেদিন একবর্ণও ঢোকেনি। ছুটি হল, বেরিয়ে সামনের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। হার্টবিট তখন টিনের চালের উপর শিল পড়ার মতো ধাঁইধপাধপ পড়ছে। স্যারের বাড়ির গলি থেকে নেহা বেরিয়ে এল, হাসি-হাসি মুখে সামনে এসে ধরিয়ে দিল একটা খাম। তারপর ‘হ্যাপি বার্থ ডে’ বলে রিকশা ডেকে উঠে পড়ে চলেও গেল। আমার অবস্থা তখন ভাষায় বর্ণনা করা শক্ত! যেন চিত্রগুপ্ত এসে খামে ভরে লিখে দিয়ে গিয়েছেন, আগামী একশো-দুশো বছর স্বর্গে সুখে কাটাব, নাকি নরকের তেলে ভাজা-ভাজা হয়ে! উপরন্তু মৌখিক একটা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যেখানে প্রত্যাশা ছিল, সেখানে পাওয়া গিয়েছে আস্ত একটা খাম! নিজের মনটাই প্যাক করে দিয়ে যায়নি তো বোকা মেয়েটা! উফ! পাগল মেয়ে!

 

সাইকেলে বসে-বসেই দুরুদুরু বুকে ফ্যাচ করে খামটা খুলে ফেললাম। গভীর কুয়োয় যেভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে তল দেখতে চায় মানুষ, সেইভাবে উপর থেকে খামের মধ্যে উঁকি মেরে দেখা গেল, ভিতরে একটা হাতে বানানো কার্ড! রাজকন্যা সামান্য এক নাগরিকের জন্য নিজের হাতে কার্ড বানিয়ে দিয়েছে? একবার নিজেকে আলতো করে একটা চিমটি কেটে বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছি না মোটেই! কার্ডটা বের করে খুলে দেখি, অভ্র পেন দিয়ে কার্ডের উপরে একটা সুদৃশ্য তিনতলা কেক এঁকেছে নেহা! উফ্‌ফ! এই অবধি যখন মেরে দিয়েছি, কার্ডটা খুললেই নিশ্চয়ই দেখব একটা ‘হ্যাঁ’ আমার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছে! যেমন ভাবা তেমন কাজ, কার্ড খুললাম। খুলে দেখি, ভিতরে হ্যাপি বার্থ ডে ইত্যাদি লেখার সঙ্গে একটা চিরকুট। তাতে মুক্তাক্ষরে লেখা,

হ্যাঁ- ০%

না- ১১০%

সেই যে হিসেব করে পার্সেন্টেজে হ্যাঁ-নায়ের সম্ভাবনা বাতলেছিলুম? বলাই বাহুল্য, আমার হিসেবে ‘হ্যাঁ’-এর পাল্লাই ভারী ছিল। আপাতত মন ভারী করে বাড়ি ফিরে নাকে-মুখে কোনওরকমে দুটো গুঁজে স্কুল গেলাম। পানু আর সতুর মুখোমুখি হব না বলে সবার নজর এড়িয়ে প্রেয়ার শুরু হওয়ার আগেই চুপিচুপি উঠে গেলাম স্কুলের ছাদে। খুঁজে মরুক পানু আর সতু! ওদের গ্যাস খেয়েই আজ আমার এই হাল! আচ্ছা প্রতিশোধ নিল শালা পানুটা, উফ্‌ফ! গল্প-উপন্যাসে-সিনেমায় দেখেছি, এরকম সময়ে নাকি মানুষ কাঁদে। শ্বাস চেপে বুক ভারী করে কাঁদোকাঁদো মুখ করলাম ছাদের এক কোণায় বসে। এক ফোঁটা জল বেরল না চোখ থেকে!

 

প্রেয়ারের ঘণ্টা পড়তেই অবশ্য সুটসুট করে নেমে আসতে হল একতলার বারান্দায়। টিফিনে আমাকে বাগে পেয়ে সমস্তটা শুনে খুব গম্ভীর হয়ে সতু বিধান দিল, “চাপ নিস না। স্যাররা কী আর সাধে ওদের গবেট বলেন! ও মেয়ে অঙ্কে কাঁচা। তোর হিসেবে হ্যাঁ ৮০% আর না ২০% হলেও সেটা অ্যাটলিস্ট ম্যাথমেটিক্যালি কারেক্ট ছিল। আর এ মেয়ের তো বেসিকেই গণ্ডগোল! ১১০%?! দূর, দূর! দূর হ!

 

বিঃ দ্রঃ এই লেখার প্রায় সমস্ত চরিত্রই সত্য। কাল্পনিক কোনও চরিত্র বা ঘটনার সঙ্গে তাদের জীবনের কোনও মিল পাওয়া গেলে তা হবে নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত ও একান্ত কাকতালীয়!

 

Advertisements

17 thoughts on “অঙ্ক জ়ানতি হয় (১৫.৬.২০১৭)

  1. Lekhar prothom dik ta vishon nostalgic. r tr prer ta to just fata fati…
    Ekdaam pran khule haslaam…….

    R ekta koth dada, “NEHA” name ta ki KALPONIK?

    Liked by 1 person

  2. Tomake to sakkhate chini na….But school sutre dada-vai Amra…Darun likhecho boss…gota lekhatai fatafati ar pore onkdin por onk kothai mne porche ..Bes nostalgic ….

    Liked by 1 person

  3. Khub bhalo laglo re… Manusher hridoy theke berono protiti onubhuti i sundor… ar tar upore sarolye bhora tukro tukro onubhutir eto sundor poribeshon lekhatar mohima onek gune barhiye diyeche… khub bhalo laglo…..

    Liked by 1 person

  4. School life ta r Barlow Vivekananda byaparta nostalgic kore urie niye gelo smriti te. Sumanasananda jir samaykal bojha jay. Chelebelay hariye gelam.

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s